
গ্রামের শৈশব মানেই একরাশ সবুজ, কাঁচা মাটির গন্ধ আর পুকুর ও খাল পাড়ে কাটানো নির্ভেজাল সময়।
এখনকার ব্যস্ত জীবনে দাঁড়িয়ে যখন পেছনে তাকাই, তখন সবচেয়ে বেশি যে দৃশ্যটি চোখে ভেসে ওঠে, তা হলো ভোরের কুয়াশা ভেদ করে ছিপ হাতে পুকুরের ধারে বসে থাকা আবার কখনো বিলে একসাথে বন্ধুরা মিলে মাছধরা ছোট্ট আমি।
শৈশবে গ্রামের পুকুর,দীঘি ও বিলে মাছ ধরার সেই আনন্দ যেন জীবনের এক নির্মল অধ্যায়, যার স্বাদ একবার যে পেয়েছে, সে কোনোদিন ভুলতে পারে না।
ভোরবেলা যখন সূর্যের আলো ধীরে ধীরে পুকুরের জলে পড়ে রূপালি ঝিলিক তুলত, তখনই শুরু হতো আমাদের মাছ ধরার আয়োজন। কারও হাতে বাঁশের ছিপ, কারও হাতে জাল, কেউবা শুধু সুতা আর কাঁটা নিয়ে হাজির।
টোপ হিসেবে কখনো কেঁচো, কখনো ভাতের মন্ড, কখনো পিঁপড়ার ডিম।
পুকুর পাড়ে বসে অপেক্ষার যে এক ধরনের উত্তেজনা, তা আজকের ডিজিটাল গেমের হাজারো লেভেলও দিতে পারে না।
মাছ ধরার আনন্দ শুধু মাছ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং অপেক্ষার সময়টুকুই ছিল সবচেয়ে উপভোগ্য।
পানিতে ভাসা ভেলার সামান্য নড়াচড়া দেখলেই বুকের ভেতর ধক করে উঠত।
মনে হতো, বুঝি বড় কোনো রুই বা কাতলা টোপ গিলেছে।
কখনো ছোট্ট পুঁটি বা টেংরা উঠলে মুখ ভার হতো, আবার পরক্ষণেই হাসি ফুটত সবার মুখে। সেই হাসির ভাগীদার ছিল বন্ধুরা, চাচাতো-ফুফাতো ভাইবোনেরা।
পুকুরের জল ছিল আমাদের খেলার মাঠ, শেখার জায়গা আর সাহসের পরীক্ষা।
মাছ ধরতে গিয়ে কতবার যে পানিতে পা পিছলে পড়ে গেছি, তার হিসাব নেই।
তবু ভয় ছিল না, ছিল একরাশ দুষ্টুমি আর স্বাধীনতার স্বাদ। দুপুরের রোদে গা পুড়িয়ে, কাদা মেখে, ভিজে কাপড়ে বাড়ি ফেরা ছিল এক অদ্ভুত গর্বের বিষয়।
মা বকতেন, কিন্তু সেই বকুনির মধ্যেও ছিল মায়া।
শুধু বিনোদন নয়, মাছ ধরা আমাদের শিখিয়েছে ধৈর্য।
দীর্ঘ সময় চুপচাপ বসে থাকা, মনোযোগ ধরে রাখা, সুযোগ বুঝে টান দেওয়া—এসবই একেকটি জীবনের শিক্ষা। আজকের প্রতিযোগিতামূলক জীবনে বুঝি, সেই পুকুরপাড়েই আমরা শিখেছিলাম অপেক্ষার মূল্য আর পরিশ্রমের ফল।
গ্রামের পুকুর ছিল সামাজিক মিলনমেলা।
বিকেলে বয়োজ্যেষ্ঠরা এসে বসতেন, গল্প করতেন, কেউ পান খেতেন, কেউ হুক্কা টানতেন। আমরা ছোটরা মাছ ধরতাম, সাঁতার কাটতাম, হৈচৈ করতাম। একেকটি পুকুর ছিল যেন ছোট্ট এক সমাজ, যেখানে সবাই সবার পরিচিত, সবার সঙ্গে সবার সম্পর্ক।
এখন সময় বদলেছে।
অনেক পুকুর ভরাট হয়ে গেছে, জায়গা নিয়েছে দালানকোঠা। শিশুরা আর কাদা মাখা পা নিয়ে ছিপ হাতে বসে থাকে না; তারা ব্যস্ত মোবাইলের পর্দায়। প্রকৃতির সঙ্গে সেই সরাসরি সম্পর্ক ক্রমেই কমে যাচ্ছে। তাই শৈশবের পুকুর আর মাছ ধরার স্মৃতি এখন শুধু নস্টালজিয়া নয়, এক ধরনের আক্ষেপও।
তবু আশার কথা হলো, স্মৃতি কখনো মুছে যায় না। সুযোগ পেলে আজও গ্রামের বাড়ি গিয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়ালে মনে হয়, সময় যেন থমকে গেছে।
বাতাসে ভেসে আসে শৈশবের ডাক।
মনে হয়, আবার যদি একবার ছিপ হাতে বসা যেত, আবার যদি ভেলার নড়াচড়ায় বুক ধড়ফড় করত।
শৈশবে গ্রামের পুকুরে ও খাল বিলে মাছ ধরার আনন্দ তাই কেবল একটি খেলার স্মৃতি নয় এটি আমাদের শিকড়ের গল্প, আমাদের বেড়ে ওঠার ইতিহাস।
যে মানুষ যত দূরেই যাক, যত বড় শহরেই থাকুক, হৃদয়ের গভীরে কোথাও না কোথাও একটি পুকুর থাকে, যেখানে সে এখনও ছোট্ট হয়ে বসে আছে, ছিপ হাতে, আশায় আর আনন্দে ভরা।
এই স্মৃতিই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সরল সুখের মূল্য কত গভীর। জীবনের সব জটিলতার মাঝেও তাই মাঝে মাঝে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই পুকুরপাড়ে, যেখানে সুখ ছিল সহজ, হাসি ছিল অকৃত্রিম, আর সময় ছিল শুধু আমাদের।
লেখক:
যুগ্ন সদস্য সচিব,
পটিয়া সচেতন নাগরিক ফোরাম।
Leave a Reply