
চট্টগ্রাম: কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের পর ‘এক নগর, দুই শহর’ ধারণাকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ২০ বছরমেয়াদি মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) চলতি বছরের জুনে চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম মহানগরীর আয়তন বর্তমানের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বাড়বে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে সমন্বিতভাবে নগর উন্নয়ন করা হবে এবং টানেলের মাধ্যমে নগরের দুই অংশকে সংযুক্ত করা হবে।
চীনের সাংহাই নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে হুয়াংপু নদী, একইভাবে তুরস্কের ইস্তাম্বুল নগরীকে বিভক্ত করেছে বসফরাস প্রণালি। নদীর দুই তীরের শহর উন্নয়ন করে এই দুই মহানগরীর সমন্বিত নগর কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর ক্ষেত্রে উন্নত এই দুটি শহরের মতো মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।
সিডিএ সূত্র জানায়, বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ঘিরে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম নগরী দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র। দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যানজট, জলাবদ্ধতা, পরিবেশগত চাপ এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সেখানে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছিল। এই বাস্তবতায় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই মাস্টারপ্ল্যানের লক্ষ্য হলো চট্টগ্রাম মহানগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোকে পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ এবং বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তরের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করা। এতে ভূমি ব্যবহার, পরিবহন ব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ, আবাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সিডিএর মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন প্রকল্পের পরিচালক ও সংস্থাটির উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী জানান, প্রকল্পটি ২০২০ সালের ৬ মে অনুমোদিত হয় এবং ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়। একই বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৮৩ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৫৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা যার মধ্যে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের জুনে।
আবু ঈসা আনছারী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পরও মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজে কোনো ধরনের সমস্যা হয়নি। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে এই মাস্টারপ্ল্যানের নীতিমালার যথেষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের এই প্রকল্পে প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। পরে প্রথম সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা করা হয়েছে যা আগের তুলনায় প্রায় ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। ২০ বছরমেয়াদি এই মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় মোট প্রায় ১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডের প্রায় ১৫৫ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা, পাঁচটি পৌরসভা—হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী ও পটিয়া এবং আটটি উপজেলার আংশিক এলাকা। উত্তরে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ও হাটহাজারীর সরকারহাট, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে রাঙ্গুনিয়া ও পটিয়া এবং দক্ষিণে সাঙ্গু নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এই পরিকল্পনা এলাকা।
প্রকল্পের আওতায় পূর্ববর্তী পরিকল্পনাগুলোর কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করে নতুন স্ট্রাকচার প্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট বৈষম্য ও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো নিরসনে প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া পয়োনিষ্কাশন, পরিবহন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন-সংক্রান্ত বিদ্যমান পরিকল্পনাগুলো পর্যালোচনা করে নতুন সমন্বিত পরিকল্পনাও তৈরি করা হচ্ছে।
মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের অংশ হিসেবে সিডিএ বিভিন্ন ধরনের প্রাথমিক ও কারিগরি জরিপ পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্টাডি এরিয়ার সীমানা নির্ধারণ, মৌজা মানচিত্রের ডিজিটালাইজেশন, স্যাটেলাইট ও ড্রোনচিত্র বিশ্লেষণ, ডিজিটাল এলিভেশন মডেল (ডিইএম) প্রস্তুত এবং গ্রাউন্ড কন্ট্রোল পয়েন্ট স্থাপন। এসব জরিপের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকার ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা হয়েছে।
পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ট্রাফিক ভলিউম কাউন্ট, পথচারী চলাচল বিশ্লেষণ, অরিজিন–ডেসটিনেশন জরিপ, আরটিকে-জিপিএস সার্ভে এবং ড্রোনচিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গণপরিবহন ব্যবস্থা, পার্কিং, মালবাহী যান চলাচল এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও মূল্যায়ন করা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের মতামত সংগ্রহের জন্য অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে পার্টিসিপেটরি র্যাপিড অ্যাপ্রেইজাল পরিচালনা করা হয়েছে। নগরীর জনসংখ্যা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, বায়ু ও শব্দদূষণ, সবুজায়ন, জলাভূমি ও পাহাড় সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কিত তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এই প্রকল্পে প্রথমবারের মতো ড্রোন জরিপ প্রযুক্তি ও মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষা একত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। ড্রোনের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকার বিস্তারিত চিত্র ধারণ করে ভবনের উচ্চতা ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) নগর মানচিত্র তৈরি করা হবে যা নগর পরিকল্পনা, জোনিং নীতিমালা, জনঘনত্ব ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
Leave a Reply