
এক সময় শীত এলেই গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে নেমে আসত এক আলাদা আমেজ। ভোরের কুয়াশা, হালকা ঠান্ডা বাতাস আর খেঁজুর রসের মিঠে ঘ্রাণ মিলেমিশে তৈরি করত শীতের স্বতন্ত্র পরিচয়। শীতকাল মানেই ছিল পিঠা-পুলির উৎসব, আর সেই উৎসবের প্রাণ ছিল খেঁজুর রস।
কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে তাকালে দেখা যায়, সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন প্রায় অদৃশ্য। শীতে খেঁজুর রস বিক্রি এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না।
এক দশক আগেও গ্রামে শীত নামার সঙ্গে সঙ্গেই গাছিরা খেঁজুর গাছ প্রস্তুত করতেন। রাতভর হাঁড়ি ঝুলত গাছে, ভোরে সেই রস সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি হতো। গ্রামের হাট, পাড়া-মহল্লা কিংবা রাস্তার পাশে দেখা যেত রসের হাঁড়ি আর ক্রেতার ভিড়। এটি শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, ছিল একটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমও। রস কেনা-বেচার সময় গল্প হতো, সম্পর্ক গড়ে উঠত।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শীতকালীন এই ঐতিহ্যের ওপর।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে শীতের সময়কাল ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। আগের মতো টানা ঠান্ডা আর থাকে না। হঠাৎ গরম পড়ে গেলে খেঁজুর গাছ থেকে রস ঝরলেও তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
ফলে রস সংগ্রহ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অনেক গাছি বলছেন, আগের তুলনায় এখন রস কম পাওয়া যায়, আর পাওয়া গেলেও মান ধরে রাখা কঠিন।
স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি এই ঐতিহ্যের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের পর কাঁচা খেঁজুর রস নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন গণমাধ্যম বারবার সতর্কতা জারি করছে।
অনেক এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাঁচা রস বিক্রি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্যের দিকটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর প্রভাব পড়েছে খেঁজুর রসের বাজারে। ফুটানো রস বা গুড় তৈরি করা হলেও কাঁচা রসের যে স্বাদ ও আবেদন, তা আর থাকে না।
ফলে ভোক্তার চাহিদা কমে যাচ্ছে।
আধুনিক জীবনের পরিবর্তনও বড় ভূমিকা রাখছে।
গ্রাম থেকে শহরে মানুষের অভিবাসন বেড়েছে। শহরকেন্দ্রিক জীবনে সময়ের অভাব, বদলে যাওয়া খাদ্যাভ্যাস এবং ফাস্টফুড সংস্কৃতি শীতকালীন ঐতিহ্যকে কোণঠাসা করে ফেলছে। এখন অনেক তরুণ প্রজন্ম খেঁজুর রসের স্বাদ জানে মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা ছবি বা ভিডিও থেকে।
বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের খুব কম।
অন্যদিকে, গ্রামেও পরিবর্তন এসেছে। খেঁজুর গাছের সংখ্যা কমছে।
কৃষিজমি ভরাট হয়ে আবাসন হচ্ছে, রাস্তা ও স্থাপনা নির্মাণে গাছ কাটা পড়ছে। পরিকল্পিতভাবে খেঁজুর গাছ রোপণের উদ্যোগ খুব কম। ফলে কাঁচামালের সংকটও প্রকট হচ্ছে।
উপরন্তু গাছি পেশা এখন আর সম্মানজনক বা লাভজনক হিসেবে দেখা হয় না।
নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়।
রাত জেগে কাজ করা, শারীরিক কষ্ট আর অনিশ্চিত আয়—সব মিলিয়ে এটি তাদের কাছে আকর্ষণ হারিয়েছে।
বাজার ব্যবস্থার আধুনিকীকরণও এখানে প্রভাব ফেলেছে।
সুপারশপ ও অনলাইন মার্কেটে বোতলজাত গুড়, প্রক্রিয়াজাত মিষ্টিজাত পণ্য সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ সেদিকেই ঝুঁকছে।
অথচ খেঁজুর রস একটি অত্যন্ত মৌসুমি ও স্থানীয় পণ্য হওয়ায় আধুনিক বাজার কাঠামোর সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। সংরক্ষণ, পরিবহন ও মান নিয়ন্ত্রণের অভাবে এটি বৃহৎ পরিসরে বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে না।
তবে এই বাস্তবতার মাঝেও সম্ভাবনা আছে।
কিছু এলাকায় স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রস সংগ্রহের জন্য বাঁশের বা প্লাস্টিকের ঢাকনা ব্যবহার, গাছ ঢেকে রাখা, দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করে গুড় বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও উদ্যোক্তারা ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে খাঁটি খেঁজুর গুড় বাজারজাত করছেন। এসব উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হলে গ্রামীণ অর্থনীতি কিছুটা হলেও চাঙ্গা হতে পারে।
খেঁজুর রস শুধু একটি খাদ্য নয়, এটি আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, শীতের স্মৃতি আর গ্রামবাংলার পরিচয়ের অংশ।
এটি হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল একটি পণ্যের বিলুপ্তি নয়, বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারার ক্ষয়। তাই সময় এসেছে নীতিনির্ধারক, গবেষক ও সমাজসচেতন মানুষের সম্মিলিতভাবে ভাবার—কীভাবে নিরাপদ, আধুনিক ও টেকসই উপায়ে এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা যায়।
আজ শীত আসে, কিন্তু খেঁজুর রস আর আগের মতো চোখে পড়ে না। হয়তো এখনো পুরোপুরি দেরি হয়ে যায়নি। সচেতন উদ্যোগ আর পরিকল্পনা থাকলে এই হারিয়ে যেতে বসা স্বাদ আবারও ফিরতে পারে আমাদের শীতের সকালে।
লেখক:
যুগ্ন সদস্য সচিব পটিয়া সচেতন নাগরিক ফোরাম।
সমাজ কর্মী ও পুরস্কার প্রাপ্ত সংগঠক।
Leave a Reply