
গত ২০২২ সালের ২০ জানুয়ারি আমি আমার মাকে হারিয়েছি। আমার পৃথিবীজুড়ে ছিল একমাত্র সম্পদ।
মায়ের ভালবাসা ছাড়া কখনো কোন কাজ করতেই পারতাম না।
পৃথিবীর সব সম্পর্কের শুরু ও শেষ যেখানে, সেই সম্পর্কটির নাম মা।
মানুষ অনেক সম্পদ অর্জন করতে পারে জীবনে, কিন্তু মায়ের ভালোবাসার সমান কোনো সম্পদ পৃথিবীতে নেই।
মা শুধু একজন জন্মদাত্রী নন, তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম আশ্রয়, প্রথম ভরসা এবং আজীবনের নিরাপত্তা।
তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, মা এ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
একটি সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই মা তাকে ধারণ করেন নিজের শরীরে, নিজের রক্তে, নিজের নিঃশ্বাসে।
নয় মাসের কষ্ট, অসহনীয় যন্ত্রণা আর সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে মা সন্তানের জন্ম দেন।
কিন্তু জন্ম দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
সন্তানের বড় হওয়া, অসুস্থ হলে জেগে থাকা, নিজের খাবার বাদ দিয়ে সন্তানকে খাওয়ানো, নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়া, এসবই মায়ের নীরব সংগ্রাম।
এই ত্যাগের কোনো হিসাব নেই, কোনো বিনিময় নেই।
শিশু যখন কথা বলতে শেখে, হাঁটতে শেখে, তখন মায়ের হাত ধরেই শেখে। আবার জীবনের কঠিন সময়ে যখন সবাই দূরে সরে যায়, তখনো মায়ের বুকটাই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে।
মা কখনো সন্তানের সাফল্যে অহংকার করেন না, বরং নীরবে দোয়া করেন। সন্তানের ব্যর্থতায় তিনি দোষারোপ করেন না, বরং শক্ত করে ধরে বলেন, আবার দাঁড়াবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা অনেক সময় মায়ের এই অবদান ভুলে যাই। চাকরি, ব্যবসা, সামাজিক ব্যস্ততা, নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে মায়ের খোঁজ নেওয়ার সময় থাকে না।
অথচ যে মা আমাদের জন্য রাত জেগেছেন, সেই মায়ের একটি ফোন কল, একটি হাসি, একটু সময় পাওয়াই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
মায়ের যত্ন নেওয়া কোনো দয়া নয়, এটি প্রতিটি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। মা অসুস্থ হলে পাশে থাকা, বয়স বাড়লে তাঁর কথা ধৈর্য নিয়ে শোনা, শারীরিক ও মানসিকভাবে তাঁর খেয়াল রাখা সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব।
মা বৃদ্ধ হলে তাঁর মেজাজ বদলাতে পারে, স্মৃতি দুর্বল হতে পারে, তখন বিরক্ত না হয়ে আরও বেশি যত্নশীল হওয়াই প্রকৃত সন্তানত্বের পরিচয়।
ধর্ম, সমাজ ও মানবিক মূল্যবোধ সব জায়গাতেই মায়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ। ধর্মীয়ভাবে মায়ের পায়ের নিচে জান্নাতের কথা বলা হয়েছে, যা মায়ের সম্মানের গভীরতা বোঝায়।
সমাজ সভ্য হয়েছে মায়ের শিক্ষায়, মানুষের নৈতিকতা গড়ে উঠেছে মায়ের আদর্শে। তাই মাকে অবহেলা করা মানে নিজের শেকড়কেই অস্বীকার করা।
মায়ের যত্ন শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ভালো ব্যবহার, সম্মান, ভালোবাসা এবং সময় দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি আদর, একটি কুশল জিজ্ঞাসা, একটি সঙ্গে বসে খাবার খাওয়া মায়ের কাছে অমূল্য।
মা কখনো বিলাসিতা চান না, চান সন্তানের ভালোবাসা ও উপস্থিতি।
আজ যার মা আছেন, তাদের জন্য সন্তানের দায়িত্ব এখনই শুরু করা উচিত। আর যাদের মা পৃথিবীতে নেই, আমার মত তাদের উচিত মায়ের স্মৃতি সম্মানের সঙ্গে ধারণ করা এবং অন্য মায়েদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া।
কারণ মা শুধু একটি সম্পর্ক নয়, মা একটি অনুভূতি, একটি জীবনদর্শন।
সবশেষে বলা যায়, মা এ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যাকে হারালে আর ফিরে পাওয়া যায় না।
তাই জীবিত থাকতেই মাকে ভালোবাসুন, সম্মান করুন, যত্ন নিন।
সন্তানের সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ তখনই হয়, যখন সে তার মায়ের মুখে শান্তির হাসি ফুটাতে পারে।
আজ মায়ের ৪র্থ মৃত্যু বার্ষিকীতে জানাই শ্রদ্ধা ও অশেষ ভালবাসা।
এমন দরদী হবে কেউ, হবে না আমার মাগো
এ দুনিয়ায় অনেক সম্পর্ক আসে যায়। অনেক মুখ চেনা হয়, অনেক কণ্ঠে ডাক শোনা যায়। কিন্তু এমন দরদী মানুষ আর কেউ হয় না, যেমনটি হয় একজন মা। মায়ের মতো করে কেউ বোঝে না, মায়ের মতো করে কেউ আগলে রাখে না, মায়ের মতো করে কেউ নিঃস্বার্থ ভালোবাসতে পারে না।
মা মানে শুধু জন্ম দেওয়া নয়। মা মানে জীবনের প্রতিটি ধাপে নিঃশব্দ পাহারা।
সন্তানের হাসিতে মায়ের মুখ ভরে ওঠে, আবার সন্তানের চোখের একফোঁটা পানিতে মায়ের বুক ভেঙে যায়। সন্তান কষ্টে থাকলে মা তা বলে দিতে পারে চোখের ভাষা না পড়েই। মায়ের এই অনুভব কোনো বইয়ে শেখা নয়, কোনো প্রশিক্ষণের ফল নয়। এটা শুধু মায়েরই থাকে।
একজন মা নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে সন্তানের পাতে খাবার তুলে দেন। নিজের অসুখ চেপে রেখে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন। সন্তানের সুখের জন্য মা কত রাত যে না ঘুমিয়ে কাটান, তার হিসাব কেউ রাখে না। আমরা বড় হই, নিজের জগৎ বানাই, ব্যস্ততায় ডুবে যাই। কিন্তু মা ঠিকই অপেক্ষায় থাকেন। কখন ফোন আসবে, কখন দরজায় পায়ের শব্দ শোনা যাবে।
পৃথিবী যতই কঠিন হোক, মায়ের কোলে মাথা রাখলে সব কষ্ট হালকা হয়ে আসে। সেই কোলের উষ্ণতা, সেই হাতের পরশ আর সেই দরদি চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর কোথাও নেই। মায়ের বকুনিও যেন আশীর্বাদ, কারণ তার প্রতিটি কথার পেছনে লুকিয়ে থাকে গভীর মমতা আর ভালো থাকার দোয়া।
সময় গেলে অনেক কিছু বদলে যায়। কিন্তু মায়ের ভালোবাসা বদলায় না। বয়স বাড়ে, শরীর দুর্বল হয়, তবু সন্তানের জন্য মায়ের চিন্তা একটুও কমে না। তাই তো বলা হয়, মা থাকলে আমরা কখনো পুরোপুরি একা হই না।
আজ যখন চারপাশে স্বার্থ আর হিসাবের ভিড়, তখন মায়ের ভালোবাসা আরও বেশি করে আলাদা হয়ে ওঠে। এই ভালোবাসার কোনো দাম নেই, কোনো তুলনা নেই।
সত্যিই, এমন দরদী মানুষ আর কেউ হবে না। হবে না আমার মাগো।
যতদিন মা আছেন, ততদিন তাঁর যত্ন নিই। তাঁর পাশে বসি, কথা বলি, সময় দিই। কারণ মা চলে গেলে শুধু একজন মানুষ নয়, জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়টাও হারিয়ে যায়।
মা নেই পৃথিবীতে, বাবাই মা, আর মাই হলেন বাবা, সৃষ্টির্কতা যেন মাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন এবং বাবাকে হায়াতে অফুরন্ত বরকত দান করেন আমিন।
লেখক: আলমগীর আলম।
যুগ্ন সদস্য সচিব :পটিয়া সচেতন নাগরিক ফোরাম।
Leave a Reply