
আলমগীর আলম,পটিয়া।
বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক বহু জনপদের মধ্যে পটিয়া একটি উজ্জ্বল নাম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ জনপদ জ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসের নানা বাঁক ও সংগ্রামের সাক্ষী এই পটিয়ার মাটিতে জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য গুণীজন, যাঁদের অবদান আজও মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। সেই সব কৃতী সন্তানদের মধ্যে অন্যতম হলেন আঞ্চলিক গান ও লোকসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী আবদুল গফুর হালী। তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন গ্রামীণ বাংলার জীবনবোধ, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগের এক অনন্য ভাষ্যকার।
১৯২৯ সালের ৬ আগস্ট চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল গফুর হালী। তাঁর পিতা আবদুস সোবহান এবং মাতা গুলতাজ খাতুন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও সংস্কৃতিমনা। কিন্তু পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ষষ্ঠ শ্রেণির বেশি এগোতে পারেনি। তবে শিক্ষার আনুষ্ঠানিক পথ রুদ্ধ হলেও জ্ঞানার্জনের পথ কখনো বন্ধ হয়নি। নিজের আগ্রহ, অধ্যবসায় এবং অসীম কৌতূহলের মাধ্যমে তিনি জীবন ও সমাজকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।
শৈশবে তিনি সাহিত্যিক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এবং চট্টগ্রামের প্রখ্যাত গায়ক-গীতিকার আসকার আলী পণ্ডিতের সাহিত্য ও সংগীতচর্চা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। পাশাপাশি সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি মানুষের আত্মিক জীবন, প্রেম, মানবতা ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভালোবাসাকে তার গানের মূল উপজীব্য করে তোলেন। ফলে তার গান কখনো কেবল বিনোদনের উপকরণ হয়ে থাকেনি, বরং মানুষের আত্মিক জাগরণ ও জীবনবোধের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, আবদুল গফুর হালী কোনো সংগীত বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেননি। তিনি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে গান শেখেননি, এমনকি হারমোনিয়াম বাজানোর প্রশিক্ষণও নেননি। অথচ স্বভাবজাত প্রতিভা, সুরের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং কঠোর সাধনার মাধ্যমে তিনি নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যান, যা আজও বিস্ময় জাগায়। অল্প বয়সেই চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ বেতার কেন্দ্রের অডিশনে অংশ নিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯৬৩ সাল থেকে তার গান নিয়মিতভাবে বেতারে প্রচারিত হতে থাকে এবং দ্রুতই তিনি শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন।
তার জীবনের পথ মোটেও সহজ ছিল না। পরিবারের সদস্যরা চাইতেন তিনি এমন কোনো পেশায় যুক্ত হোন, যা তাকে আর্থিক নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু হালী বেছে নিয়েছিলেন শিল্পের পথ। সেই পথ ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা, কিন্তু ভালোবাসায় পূর্ণ। ১৯৫৫-৫৬ সালে মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফে গান পরিবেশন করে প্রথমবারের মতো পারিশ্রমিক পাওয়ার ঘটনা তার জীবনে নতুন মোড় এনে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, গানই তার জীবনের লক্ষ্য, গানই তার অস্তিত্বের পরিচয়।
এরপর শুরু হয় তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য সংগীতযাত্রা। তিনি একের পর এক সৃষ্টি করেছেন এমন সব গান, যা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ‘মনের বাগানে ফুটিল ফুল গো’, ‘নু মাতাই নুবুলাই গেলির বন্ধুয়া’, ‘পাঞ্জাবিঅলা মনে বড় জ্বালারে’, ‘অ শ্যাম রেঙ্গুম ন যাইও’ এবং ‘দেখে যারে মাইজভাণ্ডারি হইতাছে নূরের খেলা’সহ অসংখ্য কালজয়ী গান তার অসাধারণ সৃষ্টিশীলতার সাক্ষ্য বহন করে। তার গানে প্রেম আছে, বিরহ আছে, আছে মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প, আবার আছে আধ্যাত্মিক উপলব্ধির গভীর সুর।
তার শিল্পীজীবনের পেছনে লুকিয়ে আছে এক বেদনাময় ইতিহাস। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ তার শিক্ষাজীবন থামিয়ে দেয়। দুর্ভিক্ষে মানুষের দুর্দশা, ক্ষুধা, বঞ্চনা ও অসহায়ত্ব তার মনে গভীর ছাপ ফেলে। এসব অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তার গানের ভাষা ও দর্শনকে সমৃদ্ধ করেছে। দারিদ্র্য ছিল তার নিত্যসঙ্গী। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন। এমনকি জীবনের শেষ সময়ে চিকিৎসা ব্যয়ের জন্যও তাকে অন্যের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। একজন জাতীয় সম্পদের এমন পরিণতি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।
অভাব-অনটনের মধ্যেও তিনি কখনো তার শিল্পীসত্তাকে বিসর্জন দেননি। অর্থের কাছে মাথা নত না করে তিনি শিল্পের মর্যাদা রক্ষা করেছেন আমৃত্যু। প্রায় দুই হাজারেরও বেশি গান রচনা করে তিনি বাংলা লোকসংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। শুধু গানই নয়, তিনি নাটকও রচনা করেছেন। তার সৃষ্টিশীলতা ছিল বহুমাত্রিক এবং গভীর জীবনবোধে সমৃদ্ধ।
২০১০ সালে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘মেঠোপথের গান’ তার জীবন, সংগ্রাম ও সৃষ্টিশীল কর্মযজ্ঞের এক মূল্যবান দলিল। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম তার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছে।
আবদুল গফুর হালীর প্রতিভা দেশের সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি পেয়েছে। জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যান্স হার্ডার ১৯৮৯ সালে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পরবর্তীতে তার জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা ও গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা না থাকলেও গফুর হালী নিজের চেষ্টায় যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জন করেছিলেন, তা অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিকেও বিস্মিত করার মতো।
২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর এই কিংবদন্তি শিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু মৃত্যুর মধ্য দিয়েও তার যাত্রা শেষ হয়নি। তার গান, তার দর্শন, তার শিল্পচেতনা এবং মানুষের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে অমর করে রেখেছে।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর যুগে যখন লোকসংগীত ও আঞ্চলিক সংস্কৃতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন আবদুল গফুর হালীর সৃষ্টি আমাদের শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তার গান বাংলার মাটির ঘ্রাণ বহন করে, গ্রামীণ মানুষের জীবনসংগ্রামের কথা বলে এবং মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে। নতুন প্রজন্ম যদি তার সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করে, সংরক্ষণ করে এবং আধুনিক প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে উপস্থাপন করে, তাহলে আমাদের লোকসংস্কৃতির এই অমূল্য সম্পদ আরও সমৃদ্ধ হবে।
আবদুল গফুর হালী ছিলেন মাটির মানুষ। তিনি মাটির ভাষায় মানুষের কথা বলেছেন, মানুষের সুখ-দুঃখ গেয়েছেন। তাই তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি আমাদের
Leave a Reply