
আলমগীর আলম,পটিয়া।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জনপদ পটিয়ার ইতিহাসে সামশু আলম মাস্টার এমন এক নাম, যিনি শুধুমাত্র একজন জনপ্রতিনিধি বা রাজনীতিবিদ ছিলেন না—তিনি ছিলেন মানুষের ভরসা, সাহস আর ন্যায়বোধের এক জীবন্ত প্রতীক।
তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং মানবিকতার এক অনন্য মিশ্রণ, যা আজও মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে।
পটিয়া পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা তাঁর কর্মময় জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করেছেন সাধারণ মানুষের কল্যাণে। “পাগলা সামশু” নামে তাঁর পরিচিতি কোনো কৌতুক নয়, বরং এটি তাঁর ব্যতিক্রমী সাহসিকতা, নিঃস্বার্থ মানবসেবা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের স্বীকৃতি।
শিক্ষকতা ছিল তাঁর পেশা, কিন্তু মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই ছিল তাঁর প্রকৃত পরিচয়। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম এবং ন্যায়ের চেতনা জাগিয়ে তুলতেন। কিন্তু সমাজের চারপাশে বৈষম্য, দারিদ্র্য ও বঞ্চনার নির্মম চিত্র তাঁকে বিচলিত করে তোলে। তিনি উপলব্ধি করেন—শুধু শ্রেণিকক্ষে থেকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব নয়। তাই তিনি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন, আর সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে নিয়ে আসে রাজনীতির মাঠে, মানুষের অধিকারের সংগ্রামে।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গর্বিত অধ্যায়। দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্বাধীনতার পরও তিনি থেমে থাকেননি; বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেন নতুনভাবে, নতুন উদ্যমে।
রাজনীতির মঞ্চে তাঁর পথচলা শুরু হয় জাসদের মাধ্যমে, যা ছিল তাঁর আদর্শিক অবস্থানের প্রতিফলন। পরবর্তীতে জাতীয় পার্টিতে যুক্ত হয়ে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু পদ-পদবি কখনোই তাঁর লক্ষ্য ছিল না—তিনি রাজনীতিকে দেখেছেন মানুষের সেবা করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে।
তাঁর সাহসী পদক্ষেপের অন্যতম উদাহরণ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়া। কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা তাঁকে কখনো নত করতে পারেনি। তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন খোলাখুলিভাবে, সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় লড়েছেন নির্ভীকভাবে। অনেক সময় ব্যক্তিগত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি পিছিয়ে যাননি—বরং সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
পটিয়ার উন্নয়নে তাঁর অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে পটিয়াকে পৌরসভায় উন্নীত করার আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রণী ভূমিকার অধিকারী। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শুধু প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেননি; তিনি একটি আধুনিক, মানবিক ও সেবামুখী পৌর ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেন।
পটিয়াকে জেলা করার দাবিতে প্রয়াত এ টি এম মুহিবউল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর গড়ে তোলা গণআন্দোলন ছিল দূরদর্শী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি বুঝতেন—একটি অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সঠিক প্রশাসনিক কাঠামো ও পরিকল্পনা।
“শ্রীমতী খাল” রক্ষা বাঁধ নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্যোগগুলো শুধু উন্নয়ন নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন কষ্ট লাঘবের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ ছিল।
ক্রীড়া ও সামাজিক সংগঠনেও তিনি ছিলেন সমান সক্রিয়। উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার নেতৃত্ব দেওয়া, পটিয়া মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং পেশাজীবী সমবায় সমিতির নেতৃত্ব তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভার প্রমাণ দেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন—একটি সুস্থ সমাজ গঠনে ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংগঠনের ভূমিকা অপরিসীম।
সবচেয়ে বড় কথা, সামশু আলম মাস্টার ছিলেন একজন সত্যিকারের মানবিক মানুষ। গরীব, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর দরদ ছিল অকৃত্রিম। তাঁর বাড়ি ছিল সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত—যেখানে কেউ নিরাশ হয়ে ফিরে যেত না। মানুষের দুঃখ শুনে তিনি শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করতেন না, বরং সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে নিজেই এগিয়ে যেতেন।
আজকের সময়ে যখন রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তি স্বার্থকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে, তখন সামশু আলম মাস্টারের জীবন আমাদের সামনে এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। তিনি দেখিয়েছেন—সাহস, সততা এবং মানবিকতা দিয়ে কিভাবে একজন নেতা মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারেন।
তাঁর জীবন শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য এক শক্তিশালী প্রেরণা। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করেই গড়ে উঠতে পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ সমাজ।
সামশু আলম মাস্টার—একটি নাম, একটি সংগ্রাম, একটি অমলিন ইতিহাস; যিনি মানুষের জন্য বেঁচেছিলেন, মানুষের মাঝেই চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
Leave a Reply