
বাংলাদেশে ইসলামের বিস্তার কেবল রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ নয়; এটি এ দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। ইতিহাস বলে, বাংলায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়েছে মূলত আউলিয়ায়ে কেরাম, সুফি সাধক ও পীর-মাশায়েখদের মানবিকতা, সহনশীলতা ও আধ্যাত্মিক দাওয়াতের মাধ্যমে। তাঁদের জীবনাচরণ, নৈতিকতা এবং মানবপ্রেম বাংলার সাধারণ মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। ফলে ইসলাম এ ভূখণ্ডে একটি শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির ধর্মীয় সংস্কৃতি হিসেবে বিকশিত হয়।
বাংলার ইতিহাসে হযরত শাহজালাল (রহ.), হযরত শাহপরান (রহ.), হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.), হযরত খান জাহান আলী (রহ.), হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.), হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.), হযরত শাহ আমানত (রহ.), হযরত খাজা শরফুদ্দিন চিশতী (রহ.) এবং আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ সিরিকোটি (রহ.)) -এর মতো আউলিয়ায়ে কেরামের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তাঁদের মাধ্যমে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি শিক্ষা, মানবসেবা ও সামাজিক সম্প্রীতির চর্চা গড়ে ওঠে।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম ঐতিহাসিকভাবে “বারো আউলিয়ার দেশ” হিসেবে পরিচিত। যদিও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সরকারি তালিকা নেই, তথাপি বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় হযরত সুলতান বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.), হযরত বদর আউলিয়া (রহ.), হযরত শাহ আমানত (রহ.) এবং হযরত শাহ মাস্তান (রহ.),হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী-সহ বহু সুফি সাধকের নাম উঠে এসেছে। তাঁদের খানকাহ, দরগাহ ও মাজার আজও আধ্যাত্মিক চর্চা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে বিবেচিত।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার ভাঙচুর, আউলিয়াবিরোধী প্রচারণা এবং ধর্মীয় উগ্রতার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বেসরকারি গবেষণা ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ মাসে দেশে ১০০টিরও বেশি—মতান্তরে ১১৩টি—মাজার ও সুফি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ৯৭টি মাজারে হামলার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। সর্বশেষ ঢাকা মিরপুরের শাহ আলীর মাজারে হামলা। সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। জেলাভিত্তিক হিসাবে কুমিল্লায় ১৭টি, নরসিংদীতে ১০টি এবং ঢাকায় ৯টি হামলার তথ্য উঠে এসেছে।
এই প্রবণতা নিছক কোনো স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় সহনশীলতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর সরাসরি আঘাত। কারণ মাজার কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং ইতিহাস, আধ্যাত্মিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।
এ কথা সত্য যে, মাজারকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও কুসংস্কার, অতিরঞ্জন বা অনৈসলামিক কিছু চর্চা থাকতে পারে। সেসব বিষয়ে আলেম সমাজ, গবেষক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি ও সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই অজুহাতে ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধ্বংস, মাজার ভাঙচুর কিংবা আউলিয়ায়ে কেরামের অবদান অস্বীকার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ আউলিয়ায়ে কেরামের মাধ্যমেই এই বাংলায় ইসলামের শেকড় গভীর হয়েছে এবং একটি সহনশীল মুসলিম সমাজ গড়ে উঠেছে।
সুফিবাদের মূল শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি, মানবপ্রেম, সহনশীলতা ও আল্লাহভীতি। প্রকৃত সুফিবাদ মানুষকে বিভেদ নয়, সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়; ঘৃণা নয়, ভালোবাসার আহ্বান জানায়। বর্তমান সময়ে যখন সমাজে উগ্রতা, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন সঠিক সুফিবাদ চর্চা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই মাজার ভাঙার অশুভ প্রবণতা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মীয় নেতৃত্বকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ এই বাংলায় ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আউলিয়ায়ে কেরামের প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে—সংঘাত, বিদ্বেষ ও ধ্বংসের মাধ্যমে নয়।
সৈয়দ মিয়া হাসান
ব্যাংকার, লেখক ও কলামিস্ট
Leave a Reply