
বাংলাদেশ আজ এক ভয়াবহ সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও নারী ও শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হচ্ছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে নির্মম সব ঘটনার খবর। এসব ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—এই দেশ কি ধীরে ধীরে নারী ও শিশুদের জন্য অনিরাপদ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হচ্ছে?
একটি সভ্য সমাজে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজ ঘর-বাহির কোথাও নিরাপদ নয় তারা। স্কুলে যাওয়ার পথে, কর্মস্থলে, এমনকি নিজ বাসস্থানেও নারী ও শিশুরা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। ধর্ষণের পর হত্যার মতো বর্বর ঘটনা যেন এখন নিয়মিত সংবাদে পরিণত হয়েছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির অভাবে ধর্ষক ও খুনিরা ভয়হীনভাবে অপরাধ সংঘটিত করছে। ফলে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি ঢাকা পল্লবীতে ঘটে যাওয়া দ্বিতীয় শ্রেনীর শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তার কে ধর্ষণের পর হত্যা নির্মমতার সকল ধাপ ছাড়িয়ে গেছে। এই নিষ্পাপ শিশুর সাথে এমন জঘন্যতম কাজ করতে কিভাবে পারলো? এই ধরনের জঘন্যতম কাজ করেও তাদের নেই কোন অনুশোচনা। আসলে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই এই সমস্যা সমাধান হবে না। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। শিশুদের নৈতিক শিক্ষা, নারীর প্রতি সম্মানবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমেও ইতিবাচক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারণা চালাতে হবে।
রাষ্ট্রকে অবশ্যই নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। ধর্ষককারী অপরাধীদের জন্য কোন আইনের প্রয়োজনীয়তা না দেখে তাদের কে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে ,এমন দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে ধর্ষণ সহ সকল অপরাধের মাত্রা অনেকাংশে কমে আসবে বলে ধারণা করা যায়। কারণ বাংলাদেশে দূর্বল আইন আর আইনের বিভিন্ন ফাকপোকরের কারণে যখন অপরাধীরা বের হয়ে যায় তখন তারা এই জঘন্যতম অপরাধ করতে তেমন দ্বিধা করে না। তারা ভাবে যাই করি না কেনো কিছু দিন পর তো ছাড়া পেয়েই যাবো। তাই তারা আইন কে তোয়াক্কা না করে অপরাধ করেই যাচ্ছে। এমতাবস্থায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে সমাজের প্রতিটি মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। নীরবতা কখনো সমাধান নয়; বরং নীরবতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।
বাংলাদেশকে নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে। অন্যথায় ধর্ষণ ও হত্যার এই অন্ধকার আমাদের পুরো সমাজকে গ্রাস করবে। এখনই সময় কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলার—কারণ নারী ও শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নয়।
Leave a Reply