
এক সময় বাংলার সমাজব্যবস্থা ছিল মানুষের জীবন পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
পরিবার, আত্মীয়তা, প্রতিবেশী সম্পর্ক, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল আমাদের ঐতিহ্যবাহী সমাজ কাঠামো। গ্রামের মানুষ সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে দাঁড়াত, সমস্যা হলে সমাজের প্রবীণ ও সম্মানিত ব্যক্তিরা বসে সমাধান করতেন।
সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মানুষের মধ্যে ছিল ভয়, সম্মান ও দায়িত্ববোধ।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই সমাজব্যবস্থা আজ ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে।
সমাজের ঐক্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ায় বাড়ছে পারিবারিক কলহ, সামাজিক অস্থিরতা, কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি, দাম্পত্য সংকট এবং নৈতিক অবক্ষয়।
এক সময় যে সমাজ মানুষকে রক্ষা করত, আজ সেই সমাজই অনেক জায়গায় নিষ্ক্রিয় ও বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
বাংলার গ্রামাঞ্চলে আগে “পানছল্লা” নামে পরিচিত সামাজিক বৈঠকের প্রচলন ছিল।
কোনো বিয়ে, জানাজা, রাস্তা নির্মাণ, মসজিদ-মাদরাসার উন্নয়ন কিংবা সামাজিক বিরোধ দেখা দিলে প্রতি ঘর থেকে একজন প্রতিনিধি নিয়ে বৈঠক হতো।
সেখানে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো। সমাজের সিদ্ধান্ত সবাই মেনে চলতেন।
এতে সমাজে শৃঙ্খলা বজায় থাকত এবং পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হতো।
কেউ অপরাধ করলে প্রথমে সমাজ থেকেই তাকে সতর্ক করা হতো।
ছোটখাটো বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়াত না।
পারিবারিক কলহ কিংবা জমি-জমার বিরোধও সমাজের সালিশের মাধ্যমে মিটে যেত।
সমাজের প্রবীণ ব্যক্তিদের কথা মানুষ সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করত।
তখন পরিবার ও সমাজের মধ্যে এক ধরনের মানবিক বন্ধন ছিল, যা আজ অনেকাংশে হারিয়ে গেছে।
বর্তমানে গ্রাম ও শহর উভয় জায়গাতেই সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে। মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক। প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবন সহজ করলেও পারস্পরিক যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছে।
এখন এক ছাদের নিচে থেকেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আন্তরিক আলাপ কমে গেছে।
সবাই ব্যস্ত মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ব্যক্তিগত জগৎ নিয়ে।
এই পরিবর্তনের ফলে পরিবারে ভুল বোঝাবুঝি, মানসিক দূরত্ব এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ছে।
সামান্য বিষয় নিয়েও সৃষ্টি হচ্ছে দাম্পত্য কলহ।
অনেক পরিবারে ধৈর্য, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়ায় বিচ্ছেদের ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সন্তানরা বেড়ে উঠছে অস্থির পরিবেশে, যা তাদের মানসিক বিকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু তৈয়ব বলেন পারিবারিক অশান্তির বড় একটি কারণ হলো সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অভাব।
আগে সমাজের ভয় ও সম্মান মানুষকে অনেক অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখত।
এখন সেই সামাজিক জবাবদিহিতা অনেকাংশে নেই।
ফলে কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি, ইভটিজিং, সহিংসতা এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ড উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্তমান সময়ে সমাজের নেতৃত্ব ব্যবস্থাও বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।
আগে সমাজ পরিচালনায় থাকতেন অভিজ্ঞ, শিক্ষিত, ন্যায়পরায়ণ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা।
এখন অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব নির্ধারিত হচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষমতার ভিত্তিতে।
এতে সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে এবং সমাজে বিভক্তি তৈরি হচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থনৈতিক চাপ ও বেকারত্ব।
পরিবারে আয় কমে গেলে কিংবা কর্মসংস্থানের অভাব দেখা দিলে দাম্পত্য ও পারিবারিক সম্পর্কেও চাপ তৈরি হয়।
বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম মানসিক চাপে রয়েছে।
এই চাপ থেকে অনেক পরিবারে ঝগড়া-বিবাদ ও হতাশা বাড়ছে।
অন্যদিকে, পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ ও ভোগবাদী মানসিকতাও সামাজিক মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এখন অনেকেই পরিবার ও সমাজের চেয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফলে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বাড়ছে। এতে সন্তানরা দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানির স্নেহ ও পারিবারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সমাজে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ঘাটতিও বর্তমান সংকটের একটি বড় কারণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা আগের তুলনায় কমে গেছে।
ফলে নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেও সামাজিক দায়িত্ববোধে পিছিয়ে পড়ছে।
শুধু গ্রাম নয়, শহরেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
একই ভবনে বছরের পর বছর বসবাস করলেও প্রতিবেশীদের সঙ্গে অনেকের পরিচয় নেই। আত্মীয়তার সম্পর্কগুলোও অনেকাংশে আনুষ্ঠানিক হয়ে পড়েছে।
আগে ঈদ, পূজা, বিয়ে কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে মানুষ একত্রিত হতো, এখন সেই আন্তরিকতা কমে গেছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। পরিবার ও সমাজের সমর্থন কমে যাওয়ায় মানুষ একাকীত্ব, হতাশা ও মানসিক চাপে ভুগছে। অনেক তরুণ ভুল পথে জড়িয়ে পড়ছে শুধুমাত্র সঠিক দিকনির্দেশনা ও পারিবারিক সান্নিধ্যের অভাবে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও পারিবারিক কলহ বৃদ্ধির একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফেসবুক, টিকটক কিংবা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত আসক্তি পরিবারে সময় কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গুজব, অপপ্রচার ও ভুল বোঝাবুঝি থেকেও সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে।
করণীয় কী
বিশিষ্ট কলামিস্ট নাজি উদ্দিন চৌধুরী এ্যানেল বলেন বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিপর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে সামজিক অবক্ষয় দিন দিন বাড়বে এবং আগামীর প্রজন্ম আরও বিপদগামী হওয়ার,সম্ভবনা রয়েছে।
১. পরিবারে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা জোরদার করতে হবে
সন্তানদের শুধু বইয়ের শিক্ষায় শিক্ষিত করলেই হবে না, তাদের মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক আচরণ শেখাতে হবে। পরিবার থেকেই সততা, সম্মানবোধ ও শৃঙ্খলার শিক্ষা শুরু করতে হবে।
২. সামাজিক বৈঠক ও সালিশব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করতে হবে
গ্রাম ও মহল্লাভিত্তিক সামাজিক কমিটি গঠন করে নিয়মিত বৈঠকের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে এসব সালিশ ও বৈঠক অবশ্যই ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ ও মানবাধিকারসম্মত হতে হবে। কোনোভাবেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে সমাজব্যবস্থা চলে যেতে দেওয়া যাবে না।
৩.
Leave a Reply