
আনোয়ারা-পটিয়া-চন্দনাইশ উপজেলার সীমান্তবর্তী নদী চামুদরিয়া। এই নদী চট্টগ্রামের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ নদীর রয়েছে ভৌগলিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব এবং এই নদী তিনটি উপজেলাকে এক সুতোয় গেঁথেছে। চামুদরিয়া নদী একসময় বঙ্গোপসাগরের আদি নাম ছিলো এবং এই নদীকে নিয়ে অনেক লোকজ মিথ প্রচলিত ছিল, যা চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়।
মুরালী নদী-জংশনের অদূরবর্তী চামুদরিয়া ঘাটকুলের বানিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। একসময় সড়ক যোগাযোগ সহজ ছিলোনা বলে নদীর সংযোগস্থলে গড়ে উঠতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। সড়ক যোগাযোগ এখন অনেকটা সহজ হওয়া সত্বেও ভারী মালামাল পরিবহনে এখনো নদী বা জলপথই সুবিধাজনক। চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বাণিজ্য কেন্দ্র–চাক্তাই, ইন্দ্রপোল লবনশিল্প এলাকা, বাস্তবায়নাধীন পটিয়া শিল্প এলাকা, শান্তিরহাট, দোহাজারী, খাগরিয়া সংলগ্ন এলাকার সাঙ্গু নদীর দু’তীরের কৃষিজ অঞ্চল, বরকল, টিনের হাট, মুরালী বাজার, মহাজন হাট, চামুদরিয়া- চাঁনখালি তীরের কৃষিজ ও বাণিজ্যিক অঞ্চলসমূহের জন্য চামুদরিয়া ঘাটকুল এলাকা একটি ‘পিক পয়েন্ট টু এড্রেস’। এখানে একটি ‘ওয়াই টাইপ’ সেতু তিনটি উপজেলাকে সংযুক্ত করে মধ্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। বর্তমানে এটি স্থানীয়দের অন্যতম প্রধান একটি উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেতুটির দাবিকে বেগবান ও সুসংগঠিত করার জন্য স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও সচেতন নাগরিকদের উদ্যোগে ‘চামুদরিয়া ওয়াই টাইপ সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ’ নামে ১০১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির আহ্বায়ক এম এ হাসেম রাজু এবং সদস্য সচিব এম নুরুল হুদা চৌধুরী। এছাড়া ‘আনোয়ারা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে। চামুদরিয়া ওয়াই টাইপ সেতু নির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে চট্টগ্রাম -১২, ১৩, ১৪ সংসদীয় আসনের মাননীয় সংসদ সদ্যস্যদের সাথে সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ, গণ্যমাণ্য ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ মতবিনিময় করেন। তিনটি উপজেলায় সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের জনসংযোগ, মানববন্ধন, লিফলেট বিতরণ সহ ব্যাপক জনমত গঠনে একযোগে কাজ করছে।
উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত চামুদরিয়া ঘাটকূলে ‘ওয়াই টাইপ সেতু’ তিনটি উপজেলাকে সরাসরি সড়ক পথে যুক্ত করবে এবং পূর্বে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ও পশ্চিমে পিএবি সড়কের সাথে যুক্ত হবে। এভাবে জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কে এই তিন উপজেলার অপেক্ষাকৃত অনুন্নত মধ্য অঞ্চলটি সংযুক্ত হয়ে সুষম উন্নয়নে সামিল হবে। তিন উপজেলার কৃষিজ ও অন্যান্য পণ্যের সহজ ও স্বল্পব্যয় পরিবহন নিশ্চিত হবে-সময়ও বাঁচবে। কৃষক ও অন্যান্য উৎপাদনকারীরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবে। পাশাপাশি এ সেতুকে ঘিরে গড়ে উঠবে ছোট-বড় শিল্প কারখানা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। এতে তিন উপজেলার মানুষের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাঁদের আর্থিক অবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এ সেতু হবে আনোয়ারা-চন্দনাইশ-পটিয়ার অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ‘গেম চেঞ্জার।’
চামুদরিয়া ওয়াই টাইপ সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি এম এ হাশেম রাজু বলেন, “চামুদরিয়া ঘাটে একটি আধুনিক ওয়াই টাইপ সেতু নির্মিত হলে তিন উপজেলার লাখো মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক প্রবাহে নতুন গতি আসবে। আনোয়ারা-পটিয়া- চন্দনাইশে এখন অত্যন্ত উদার, উন্নয়নকামী, দেশপ্রেমে ঋদ্ধ মাননীয় সাংসদবর্গ নির্বাচিত হয়েছেন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে তাঁরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিবিড় নির্দেশনায় বিপুলাকার উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। যেহেতু তাঁরা আনোয়ারা-পটিয়া-চন্দনাইশের কীর্তিমান সন্তান, সহজাত দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনে ‘সবার আগে আনোয়ারা-পটিয়া-চন্দনাইশে সেতুটি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন -এ দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করি।”
আনোয়ারা ফাউন্ডেশনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নাছির উদ্দিন আহমদ শাহ বলেন, “চাঁনখালী খালের চামুদরিয়া ঘাটে ওয়াই টাইপ সেতু নির্মিত হলে পটিয়া, আনোয়ারা ও চন্দনাইশ উপজেলার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, সময় ও ব্যয় উভয়ই কমবে। একই সঙ্গে আনোয়ারা শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ আরও গতিশীল হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে চামুদরীয়া ঘাটে প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় পারাপার করছে। বর্ষা মৌসুমে এ দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। সরকারের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের যুগে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এখনো সেতু না থাকা দুঃখজনক। দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রকল্প গ্রহণ, জননিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে দ্রুত সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।”
দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য, জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে ও সরব উচ্চারণে এবং তিন উপজেলার মাননীয় সংসদ সদস্যদের আন্তরিক ইচ্ছা ও পদক্ষেপে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মতিতে চামুদরিয়া ‘ওয়াই টাইপ’ সেতু অচিরেই বাস্তবায়িত হবে মনে করেন বিজ্ঞ মহল।
চাঁনখালী খালের চামুদরিয়া ঘাটে একটি পরিকল্পিত ‘ওয়াই টাইপ’ সেতু নির্মিত হলে একযোগে তিনটি উপজেলার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চল আনোয়ারার সঙ্গে পটিয়া ও চন্দনাইশের যোগাযোগ আরও গতিশীল হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে চামুদরীয়া ঘাট দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে পারাপার হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে এ দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। তাই জননিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে দ্রুত সেতু নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।
লেখকঃ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, চন্দনাইশ সিভিল সোসাইটি।
Leave a Reply