
প্রবীণ রাজনীতিক ও চলচ্চিত্রকার শফি বিক্রমপুরী একটি গল্পে বলেছিলেন, এক রাজনৈতিক নেতার ছোট ছেলে বাবার কাছে বায়না ধরল—সে রাজনীতি করবে, তাই তাকে রাজনীতির পাঠ শেখাতে হবে। বাবা প্রথমে নিরুৎসাহিত করলেন। বললেন, রাজনীতি সহজ বিষয় নয়; এতে যেমন সম্মান আছে, তেমনি আছে কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু ছেলেটি অনড়। শেষ পর্যন্ত বাবা তাকে রাজনীতির প্রথম পাঠ শেখানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। একটি টেবিলের ওপর দাঁড় করিয়ে বললেন-লাফ দাও, আমি তোমাকে ধরে নেব। ছেলে সরল বিশ্বাসে লাফ দিল। কিন্তু বাবা তাকে ধরলেন না; বরং একপাশে সরে গেলেন। মেঝেতে পড়ে ছেলের হাঁটু-কনুই ছিড়ে গেল। ব্যথায় কাঁদতে কাঁদতে সে জানতে চাইল- আপনি আমাকে ধরলেন না কেন? বাবা বললেন- আজ তুমি রাজনীতির প্রথম শিক্ষা পেলে। মনে রাখবে, রাজনীতিতে কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যায় না। বিশ্বাস থাকবে, কিন্তু সেই বিশ্বাসের সঙ্গে থাকতে হবে বিচক্ষণতা ও সতর্কতা। গল্পটিতে অন্তর্নিহিত শিক্ষা বাস্তব জীবনের রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
রাজনীতি মূলত মানুষের কল্যাণে রাষ্ট্র পরিচালনার শিল্প। কিন্তু ক্ষমতা, প্রভাব, আদর্শ, ব্যক্তিস্বার্থ এবং দলীয় প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় এই অঙ্গন অনেক সময় জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা প্রায়ই বলেন, রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই; থাকে কেবল স্বার্থ, প্রয়োজন ও সময়ের সমীকরণ। সেই সমীকরণ বদলালে সম্পর্কের রূপও বদলে যায়।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বাস ও বিশ্বাসঘাতকতা রাজনীতির এক চিরন্তন বাস্তবতা। ইসলামের ইতিহাসে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা, রামায়ণে বিভীষণের ভূমিকা কিংবা ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ—এসব ঘটনাকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক আলোচনায় আনুগত্য, কৌশল ও বিশ্বাসঘাতকতার দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের ক্ষেত্রে মীর জাফরের ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। একইভাবে টিপু সুলতানের পতনের ইতিহাসে মীর সাদিকের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার ক্ষমতাচ্যুতি, জুলফিকার আলী ভুট্টোর পতন কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনাগুলোও রাজনৈতিক আস্থা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জটিল বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসও এ ধরনের বহু ঘটনার সাক্ষী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড কিংবা ২০০৭ সালের রাজনৈতিক সংকট—প্রতিটি ঘটনাই ইতিহাসের অংশ। এসব ঘটনার ব্যাখ্যা ও মূল্যায়নে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—রাজনীতিতে নেতৃত্বের জন্য শুধু জনপ্রিয়তা নয়, দূরদর্শিতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের দক্ষতাও অপরিহার্য।
রাজনীতিতে বিশ্বাস অবশ্যই প্রয়োজন। বিশ্বাস ছাড়া দল গড়ে ওঠে না, নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না, রাষ্ট্রও পরিচালিত হয় না। কিন্তু সেই বিশ্বাস যদি অন্ধ আনুগত্যে পরিণত হয়, তবে তা ব্যক্তি, দল এবং রাষ্ট্র—সবার জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আবার অতিরিক্ত অবিশ্বাসও রাজনৈতিক সংগঠনকে দুর্বল করে দেয়। তাই ভারসাম্যই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একজন দক্ষ রাজনীতিক জানেন, মানুষের ওপর আস্থা রাখতে হয়, কিন্তু সেই আস্থাকে সব সময় জবাবদিহি, নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সুরক্ষিত রাখতে হয়। নেতৃত্বের শক্তি কেবল জনপ্রিয়তায় নয়; সঠিক সময়ে সঠিক মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যেও নিহিত।
আমার লেখার শুরুতে বর্ণিত গল্পটির মূল শিক্ষা এখানেই। রাজনীতিতে মানুষের প্রয়োজন অপরিসীম, কিন্তু মানুষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা আরও বেশি প্রয়োজন। কারণ ইতিহাস আমাদের বারবার শিখিয়েছে—অন্ধ বিশ্বাস যেমন বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তেমনি অকারণ অবিশ্বাসও নেতৃত্বকে একাকী ও দুর্বল করে তোলে।
সুতরাং রাজনীতিতে বিশ্বাস থাকবে, তবে তা হবে বিবেচনাপ্রসূত; আস্থা থাকবে, তবে তা হবে যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে; নেতৃত্ব থাকবে, তবে তা হবে নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং দূরদর্শিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত আমাদের এই শিক্ষাই দেয়—বিশ্বাসের মূল্য আছে, কিন্তু সেই বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সতর্কতা, প্রজ্ঞা এবং নৈতিক সাহস।
লেখক: কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক। সম্পাদক, শঙ্খতীর। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, চন্দনাইশ সিভিল সোসাইটি।
Leave a Reply