
লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া
একটি শহরকে কতটা উন্নত, আধুনিক কিংবা সমৃদ্ধ বলা যায়, তার পরিচয় শুধু রাস্তাঘাট, নালা নর্দমা, সুউচ্চ ভবন কিংবা বড় বড় স্থাপনায় পাওয়া যায় না। একটি শহরের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে নাগরিকদের আচরণ, পরিচ্ছন্নতা, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের মধ্যে। ঘরের ভেতর যত্ন নিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে বাইরে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে রাখলে সেই পরিচ্ছন্নতা কখনো পূর্ণতা পায় না। আমাদের চারপাশের পরিবেশ আসলে আমাদের মানসিকতারই প্রতিচ্ছবি। আর এই অসচেতনতা ও অব্যবস্থাপনার সুযোগেই তৈরি হয় রোগজীবাণু বিস্তারের পরিবেশ, জন্ম নেয় এডিস মশার প্রজননস্থল এবং বাড়তে থাকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি। অন্যদিকে কোনো সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়লে বিষয়টি শুধু নাগরিক সচেতনতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কতটা প্রস্তুত, রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি কতটা কার্যকর এবং সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা সক্ষম।
ডেঙ্গু এখন আর কেবল একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের নগরজীবন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের বড় পরীক্ষা। বর্ষা ও বর্ষা পরবর্তী সময়ে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বাড়ে। হাসপাতালে রোগীর চাপ বৃদ্ধি পায়, পরিবারে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়, কর্মক্ষম মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অনেক পরিবারকে বহন করতে হয় বাড়তি চিকিৎসা ব্যয়। অথচ ডেঙ্গু প্রতিরোধের বড় একটি অংশ আমাদের নিজেদের হাতের নাগালেই রয়েছে। বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, পরিত্যক্ত পাত্র সরিয়ে ফেলা, ছাদ ও বারান্দা পরিষ্কার রাখা, ড্রেন ও নালা সচল রাখা এবং যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলা খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, নিয়মিত অভ্যাস এবং দায়িত্ববোধ। একটি ছোট পাত্রে জমে থাকা পানি আমাদের চোখে তুচ্ছ মনে হলেও সেটিই এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে জনস্বাস্থ্যের সংকটকে শুধু নাগরিকের অসচেতনতার ফল হিসেবে দেখলে বাস্তবতার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। সাম্প্রতিক হামের প্রকোপ আমাদের সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন তুলেছে। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত? হাম এমন একটি রোগ, যার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে এবং যথাযথ টিকাদানের মাধ্যমে এর বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই কোনো এলাকায় হামের প্রকোপ বাড়লে শুধু অভিভাবকের অসচেতনতার কথা বলে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। টিকাদানের আওতা কতটা বিস্তৃত, বাদপড়া শিশুদের শনাক্ত করা হচ্ছে কি না, প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকা পৌঁছাচ্ছে কি না, রোগ নজরদারি কতটা কার্যকর এবং আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু ও হাম দুটি ভিন্ন রোগ এবং তাদের প্রতিরোধের পদ্ধতিও ভিন্ন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে হাম প্রতিরোধে টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুটি রোগই আমাদের একটি অভিন্ন শিক্ষা দেয়। প্রতিরোধের জায়গায় দুর্বলতা তৈরি হলে তার চাপ গিয়ে পড়ে চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর। রোগী বাড়লে হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে এবং পরিবার ও রাষ্ট্র উভয়ের ওপর অতিরিক্ত বোঝা তৈরি হয়। তাই জনস্বাস্থ্যে রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘আসুন এবার রাষ্ট্রকে, দেশকে আমরা পুনর্গঠন করি’ আহ্বানটি শুধু একটি পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলার একটি বৃহত্তর বার্তা রয়েছে। তরুণ সমাজ, স্কাউটস, বিএনসিসি, গার্লস গাইড, শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করার আহ্বানও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ পরিচ্ছন্ন রাষ্ট্র গড়ে তোলা শুধু সিটি করপোরেশন, পৌরসভা কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব নয়। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করবে, কিন্তু নাগরিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব স্বীকার করতে হবে।
আমাদের মধ্যে একটি প্রবণতা রয়েছে, রাষ্ট্রের কাছে সব সমস্যার সমাধান প্রত্যাশা করা। রাস্তা পরিষ্কার করবে কর্তৃপক্ষ, ড্রেন পরিষ্কার করবে স্থানীয় প্রশাসন, ময়লা অপসারণ করবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং মশা নিধন করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। এসব অবশ্যই রাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু নিজের বাড়ির ছাদে পানি জমে থাকলে, বারান্দায় পরিত্যক্ত পাত্র পড়ে থাকলে কিংবা দোকান ও প্রতিষ্ঠানের পাশে ময়লা জমে থাকলে তার দায়িত্বও আমাদের নিতে হবে। শুধু সরকারি ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কারণ মশা নিধনের পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রথম যুদ্ধ তাই শুরু হতে পারে নিজের ঘর থেকেই। সপ্তাহে অন্তত একদিন পরিবারের সদস্যরা মিলে বাড়ির চারপাশ পরিদর্শন করা যেতে পারে। ফুলের টবের নিচে, বালতি, ড্রাম, বোতল, নারকেলের খোসা, টিনের কৌটা কিংবা নির্মাণসামগ্রীর পাত্রে পানি জমে আছে কি না তা দেখতে হবে। একইভাবে স্কুল, কলেজ, অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নির্মাণাধীন ভবনেও নিয়মিত পরিদর্শন প্রয়োজন। ‘সপ্তাহে এক ঘণ্টা পরিচ্ছন্নতার জন্য’ এমন একটি সামাজিক অঙ্গীকার যদি প্রতিটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করে, তাহলে তা শুধু ডেঙ্গু প্রতিরোধে নয়, মানুষের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখবে।
এ ক্ষেত্রে তরুণ সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা দল গঠন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবীরা নিয়মিতভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠান ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করে কোথায় পানি জমছে, কোথায় ময়লা ফেলা হচ্ছে কিংবা কোথায় এডিস মশার প্রজননের সম্ভাবনা রয়েছে তা চিহ্নিত করতে পারে। পাড়া মহল্লায় যুবকদের নেতৃত্বে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। সেখানে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, চিকিৎসক, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও সাধারণ নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। তবে কোনো অভিযান যেন শুধু একদিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
হামের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র ও জনগণের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। কোনো শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে কি না, তা শনাক্ত করা, প্রত্যন্ত এলাকায় টিকা পৌঁছে দেওয়া, মানুষের মধ্যে টিকা সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি করা এবং রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা জরুরি। অভিভাবকদেরও সন্তানের বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডেঙ্গু ও হাম নিয়ে সঠিক তথ্য প্রচার করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত গুজব, ভুল চিকিৎসা পরামর্শ কিংবা টিকা সম্পর্কে ভিত্তিহীন প্রচারণা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসন, মশক নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। হামের ক্ষেত্রে টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা, বাদপড়া শিশুদের শনাক্ত করা, রোগ নজরদারি বাড়ানো এবং সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়েই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে কোনো প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিস্তার দীর্ঘায়িত হলে তার দায় শুধু জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। আবার নাগরিক অসচেতনতার অজুহাতে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি, ‘সরকার কী করছে?’ এখন সেই প্রশ্নের পাশে আরেকটি প্রশ্ন রাখার সময় এসেছে। ‘আমি কী করছি?’ আমার বাড়ির সামনে কি ময়লা পড়ে আছে? আমার ছাদে কি পানি জমে আছে? আমার প্রতিষ্ঠানের ড্রেনে কি পানি আটকে আছে? আমার সন্তানের প্রয়োজনীয় টিকা সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেটি কি আমি খোঁজ নিয়েছি? এই ছোট ছোট প্রশ্নের উত্তরই বড় সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। জনস্বাস্থ্যকে শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক করে দেখলে চলবে না। মানুষ যাতে আক্রান্ত হওয়ার আগেই সুরক্ষিত থাকে, সেই প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করাই হতে হবে আমাদের মূল লক্ষ্য।
একটি পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব সরকারের যেমন, তেমনি প্রতিটি নাগরিকের। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুধু মশার বিরুদ্ধে লড়াই নয়। এটি আমাদের অসচেতনতা, অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধেও লড়াই। আর হামের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা নয়। এটি সময়মতো টিকাদান, রোগ নজরদারি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থারও পরীক্ষা। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করবে, প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করবে এবং জনগণ নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করবে। রাষ্ট্র ও নাগরিকের এই সম্মিলিত দায়িত্ববোধই পারে একটি পরিচ্ছন্ন, সচেতন, নিরাপদ ও সুস্থ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
লেখক পরিচিতি: কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক।
Leave a Reply