
কখনো কখনো একটি ছবি, একটি শব্দ কিংবা একটি ছোট্ট প্রতীক আমাদের বহু বছর পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আমার কাছে বিটিভির লাল-সবুজের লোগো তেমনই এক স্মৃতির দরজা। টেলিভিশনের পর্দায় সেই পরিচিত প্রতীকটি ভেসে উঠলেই মনে পড়ে যায় শৈশবের সেই সন্ধ্যাগুলো—ঘরের সবাই মিলে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা, অনুষ্ঠান শুরুর অপেক্ষা, প্রিয় নাটক দেখার আনন্দ, ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য অধীর আগ্রহ। তখন বিনোদনের জগৎ এত বিস্তৃত ছিল না; একটি টেলিভিশনই ছিল আমাদের ঘরের জানালা, আর সেই জানালার সবচেয়ে পরিচিত নাম ছিল বিটিভি। সাড়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিটিভি শুধু অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেনি; এটি আমাদের জীবনের অসংখ্য মুহূর্তের সঙ্গে মিশে গেছে। কারও শৈশব, কারও কৈশোর, কারও পারিবারিক আনন্দ কিংবা কোনো বিশেষ দিনের স্মৃতি—কোথাও না কোথাও বিটিভি তার সাক্ষী হয়ে আছে। তাই বিটিভির লাল-সবুজের লোগো আমার কাছে নিছক একটি নকশা নয়; এটি একটি সময়ের স্মৃতি, একটি প্রজন্মের আবেগ।
সেই ঐতিহ্যবাহী লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগের কথা শুনে তাই মনে প্রশ্ন জাগে—কেন? সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, মানুষের রুচি ও বিনোদনের ধরনও বদলেছে। বিটিভিকেও সময়ের সঙ্গে বদলাতে হবে—এতে কোনো দ্বিমত নেই। অনুষ্ঠান নির্মাণে নতুনত্ব, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শক্তিশালী উপস্থিতি এবং তরুণ প্রজন্মের উপযোগী কনটেন্ট—এসব ক্ষেত্রে বিটিভির আরও এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আধুনিকতার জন্য কি পরিচিত প্রতীকটিকেও বদলে ফেলতে হবে? আমার মনে হয়, না। একটি লোগো বছরের পর বছর মানুষের চোখের সামনে থাকতে থাকতে একসময় শুধু একটি নকশা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং মানুষের স্মৃতির অংশ। বিটিভির লাল-সবুজের লোগোও তেমনই। এর সঙ্গে যেমন ব্যক্তিগত স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তেমনি জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সম্প্রচার ইতিহাস।
আর লাল-সবুজ আমাদের কাছে শুধু দুটি রং নয়। এটি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার রং, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একটি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই রঙের উপস্থিতিরও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। তাই আধুনিকতার নামে এই ঐতিহ্য একেবারে মুছে ফেলার প্রয়োজন দেখি না। বরং বর্তমান লোগোটিকে আরও আধুনিক, নান্দনিক ও ডিজিটাল মাধ্যমের উপযোগী করে তোলা যেতে পারে; প্রয়োজনে অ্যানিমেটেড সংস্করণ বা নতুন ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনাও আসতে পারে। কিন্তু মূল লাল-সবুজের পরিচয়টি থাকুক। কারণ নতুন কিছু তৈরি করার জন্য পুরোনো সবকিছু ভেঙে ফেলতে হয় না। ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়েও আধুনিক হওয়া যায়—বরং সেটিই হতে পারে সবচেয়ে সুন্দর ও দূরদর্শী আধুনিকায়ন।
আজ বিটিভির প্রকৃত প্রয়োজন লোগো পরিবর্তন নয়; প্রয়োজন দর্শকের হৃদয়ে আবারও জায়গা করে নেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব, ওটিটি এবং অসংখ্য বেসরকারি চ্যানেলের ভিড়ে বিটিভিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। মানসম্মত নাটক, ভালো অনুষ্ঠান, বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ, সৃজনশীল কনটেন্ট এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বিটিভিকে নতুন প্রাণ দিতে হবে। একটি নতুন লোগো হয়তো চোখে নতুনত্ব আনবে, কিন্তু একটি ভালো অনুষ্ঠানই পারে মানুষের মনে জায়গা করে নিতে। তাই বিটিভির পরিবর্তন চাই—অবশ্যই চাই। কিন্তু সেই পরিবর্তন হোক তার কাজের ধরনে, অনুষ্ঠানে, প্রযুক্তিতে ও উপস্থাপনায়; তার শেকড়ে নয়।
আজও কখনো পুরোনো কোনো বিটিভির অনুষ্ঠান চোখে পড়লে কিংবা সেই পরিচিত লাল-সবুজের প্রতীকটি মনে ভেসে উঠলে বুকের ভেতর কেমন যেন একটা নরম অনুভূতি জেগে ওঠে। মনে হয়, ফিরে যাই সেই দিনগুলোতে—যখন আনন্দ ছিল সহজ, অপেক্ষা ছিল মধুর, আর টেলিভিশনের পর্দায় একটি পরিচিত লোগো দেখেই মনে হতো, ‘বিটিভি শুরু হয়েছে।’ সেই অনুভূতিটুকু কি আমরা এত সহজে হারিয়ে ফেলতে চাই? স্মৃতি তো নতুন করে বানানো যায় না। একটি প্রজন্মের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কও নতুন কোনো নকশা দিয়ে তৈরি করা যায় না। তাই বিটিভির আধুনিকায়ন হোক, পরিবর্তন হোক—কিন্তু লাল-সবুজের সেই পরিচিত প্রতীকটি থাকুক। থাকুক আমাদের শৈশবের স্মৃতিতে, পারিবারিক আনন্দে, বাংলাদেশের সম্প্রচার ইতিহাসে। কারণ, কিছু প্রতীক শুধু চোখে দেখা যায় না—তারা আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকে।
লেখক পরিচিতি: কলাম লেখক, সংগঠক ও সমাজসেবী।
Leave a Reply