
কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ছিল বহমান এক অগ্নিস্রোত; যেখানে বিদ্রোহের তেজের পাশে পাশাপাশি বয়ে চলেছে প্রেম, বিরহ, বেদনা ও মানবতার নির্মল ধারা। তাঁর কবিতায় যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত হয়েছে দুর্বার প্রতিবাদ, তেমনি প্রেমের কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে হৃদয়ের গভীরতম আকুতি। আর সেই প্রেমময় জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে আছে যে নামটি, তিনি প্রমীলা দেবী। নজরুলের জীবনে প্রমীলার আগমন ছিল নিছক কোনো ব্যক্তিগত প্রেমের ঘটনা নয়; এটি ছিল তাঁর জীবনদর্শনেরও এক বাস্তব অধ্যায়। ধর্ম, জাতি ও সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার যে সাহস নজরুল তাঁর সাহিত্য ও জীবনে ধারণ করেছিলেন, প্রমীলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যেন তারই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
কুমিল্লায় প্রথম পরিচয়ের দিনগুলো
১৯২১ সাল নজরুলের জীবনে নানা দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় কলকাতায় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সূত্রে পুস্তক প্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই নজরুল প্রথম কুমিল্লায় আসেন। কুমিল্লার মুরাদনগরের দৌলতপুরে আলী আকবর খানের আত্মীয়দের বাড়িতে তাঁর যাতায়াত শুরু হয়। এই সময়েই তাঁর পরিচয় ঘটে আশালতা সেনগুপ্তের সঙ্গে, যিনি পরবর্তীকালে ‘প্রমীলা’ নামে নজরুলের জীবনসঙ্গিনী হয়ে উঠবেন। আশালতা ছিলেন স্বভাবতই প্রাণবন্ত, সংবেদনশীল ও সংগীতপ্রিয়। কুমিল্লার সেই দিনগুলোতে নজরুলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ক্রমে ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। কবির জীবন তখনও স্থির কোনো বন্দরে নোঙর করেনি। সাহিত্য, রাজনীতি, স্বদেশচেতনা এবং জীবনের নানা অনিশ্চয়তা তাঁকে প্রতিনিয়ত টেনে নিয়ে যাচ্ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতার দিকে। সেই অস্থির জীবনের ভেতরেই প্রমীলার উপস্থিতি যেন এনে দিয়েছিল এক ভিন্নতর অনুভব। প্রথম পরিচয় থেকেই যে সম্পর্ক পরিণত প্রেমে রূপ নিয়েছিল—এমন সরল ব্যাখ্যা হয়তো ইতিহাসের সবটুকু ধারণ করে না। কারণ একই সময়ে নজরুলের জীবনে নার্গিসকে ঘিরে আরেকটি সম্পর্ক ও বিবাহের ঘটনা ঘটে। সেই সম্পর্কের ভাঙন নজরুলের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু জীবনের সেই দুঃসময় অতিক্রম করেই তাঁর ও প্রমীলার সম্পর্ক ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে ওঠে।
প্রেমের পথে নজরুল
১৯২২ সালে নজরুল আবার কুমিল্লায় আসেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে প্রমীলার সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করে। তাঁদের মধ্যে গড়ে ওঠে এমন এক আত্মিক বন্ধন, যা পরবর্তীকালে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েও টিকে থাকে। নজরুলের প্রেম ছিল প্রচলিত সামাজিক হিসাবের প্রেম নয়। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ছিল মানুষের পরিচয়েই। তাই একজন মুসলমান কবি ও একজন হিন্দু পরিবারের তরুণীর প্রেম তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে যে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে, তা তিনি জানতেন। তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। এই প্রেমের মধ্যে ছিল সাহস, ছিল আত্মমর্যাদা, ছিল সামাজিক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। নজরুল যে কবিতায় বারবার সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, নিজের জীবনেও তিনি সেই মানবিক বিশ্বাসকে ধারণ করেছিলেন।
প্রণয় যখন সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি
নজরুল ও প্রমীলার সম্পর্ক যখন গভীরতর হলো, তখন তাঁদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল সমাজ ও পরিবারের বিরোধিতা। ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এই সম্পর্ককে সহজভাবে মেনে নেওয়া তৎকালীন সমাজের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু প্রমীলার মা গিরিবালা দেবী মেয়ের ইচ্ছার প্রতি শেষ পর্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে নজরুল ও প্রমীলার সম্পর্ক পরিণয়ের দিকে এগিয়ে যায়। এখানেই তাঁদের প্রেমের বিশেষত্ব। এটি কেবল দুজন মানুষের ব্যক্তিগত ভালোবাসা ছিল না; এর মধ্যে নিহিত ছিল সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে এক মানবিক অবস্থান। নজরুল তাঁর জীবনের মধ্য দিয়েই যেন বলতে চেয়েছিলেন, ভালোবাসার কাছে ধর্মের দেয়ালও শেষ পর্যন্ত ক্ষুদ্র হয়ে যায়।
২৫ এপ্রিল ১৯২৪: প্রেমের পরিণয়
অবশেষে আসে সেই প্রতীক্ষিত দিন- ২৫ এপ্রিল ১৯২৪। কলকাতায় কাজী নজরুল ইসলাম ও প্রমীলা দেবীর বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই বিবাহ ছিল তৎকালীন সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির বিচারে এক সাহসী পদক্ষেপ। একজন মুসলমান কবি এবং হিন্দু পরিবারের কন্যার এই বিবাহকে ঘিরে নানা আলোচনা ও বিরোধিতা ছিল। কিন্তু তাঁদের ভালোবাসা সামাজিক সংকীর্ণতার কাছে পরাজিত হয়নি। বিবাহের পর প্রমীলা শুধু নজরুলের স্ত্রী হয়ে থাকেননি; হয়ে উঠেছিলেন তাঁর জীবনসংগ্রামের সহযাত্রী। কবির দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা, সাহিত্যিক সংগ্রাম, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, কারাবরণ; জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে প্রমীলা তাঁর পাশে ছিলেন। নজরুলের জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল আরও কঠিন। দুরারোগ্য অসুস্থতা তাঁকে ধীরে ধীরে বাক্শক্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেই দীর্ঘ অন্ধকার সময়েও প্রমীলা তাঁর পাশে থেকেছেন। নিজের জীবনকেও উৎসর্গ করেছেন কবির সেবায়। ফলে তাঁদের দাম্পত্য শুধু প্রেমের নয়, ত্যাগ ও সহমর্মিতারও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
প্রমীলা: নজরুলের প্রেম ও মানবতার প্রতিচ্ছবি
নজরুলের সাহিত্য পাঠ করলে আমরা একজন বিদ্রোহীকে দেখি, একজন প্রেমিককে দেখি, একজন মানবতাবাদীকে দেখি। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিজীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই তিন সত্তাই কোথাও গিয়ে একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে আছে। প্রমীলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সেই মিলনেরই এক বাস্তব রূপ। তাঁদের প্রেম দেখিয়েছে; মানুষের হৃদয়ের বন্ধন ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বড় হতে পারে, সামাজিক বিধিনিষেধের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। ভালোবাসা যখন সত্য ও গভীর হয়, তখন তা কেবল দুটি মানুষকে নয়, দুটি ভিন্ন সামাজিক পরিচয়কেও এক সেতুবন্ধনে যুক্ত করতে পারে। তাই নজরুলের জীবনে প্রমীলার আগমনকে কেবল একটি প্রেমকাহিনির অধ্যায় হিসেবে দেখলে তাঁর তাৎপর্যকে ছোট করে দেখা হবে। প্রমীলা ছিলেন নজরুলের জীবনের প্রেম, সহযাত্রা, বেদনা ও আশ্রয়ের এক দীর্ঘ অধ্যায়।
Leave a Reply