1. news@dainikchattogramerkhabor.com : Admin Admin : Admin Admin
  2. info@dainikchattogramerkhabor.com : admin :
শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:২৯ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডে মৃত্যুফাঁদ: দুর্ঘটনা নাকি নিরাপত্তার ব্যর্থতা? – লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া ১২ রবিউল আউয়াল উপলক্ষে পটিয়ায় এতিম শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ “স্ট্রিট ফুডের (ভাসমান খাবারের দোকান) স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং এর জন্য আইনি তদারকি নিশ্চিতকরণ” বিষয়ক সেমিনার পটিয়ায় হযরত বদর আউলিয়া ইবতেদায়ী মাদ্রাসার একাডেমিক ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন CLUB 94 BD এর উদ্যোগে হেদায়েত উল্লাহ তুর্কীর জন্মদিন পালিত পটিয়ায় তোহা খুনের সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তারে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম, এলাকাবাসীর মানববন্ধন বিশিষ্ট কলামিস্ট ও সমাজকর্মী নেছার আহমেদ খানের বড় ভাই রফিক আহমেদ খানের মৃত্যুতে শোক এসএসসিতে সেরা ফল: শতভাগ পাসের শীর্ষে হাজেরা মেমোরিয়াল মডেল স্কুল জীবন্ত শিশুর মাথায় ছাদ নেই, অথচ রাষ্ট্রের কোটি টাকা ইট পাথরের স্থাপনায় — এ কেমন অগ্রাধিকার? তীব্র গরমে চা শ্রমিকদের পাশে ইস্পাহানী’র জেরিন চা বাগান ব্যবস্থাপক

সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডে মৃত্যুফাঁদ: দুর্ঘটনা নাকি নিরাপত্তার ব্যর্থতা? – লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া

  • সময় শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৮ পঠিত

 

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডে আবারও লাশের সারি। ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে পুরোনো একটি জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ গেল ৯ শ্রমিকের। আহত ও অসুস্থ হয়েছেন আরও কয়েকজন। স্বজনদের আহাজারি, হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষমাণ পরিবার আর দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতার দৃশ্য আমাদের আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে; জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের নিরাপত্তা কি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে? নাকি মুনাফা ও উৎপাদন ব্যয়ের হিসাবের কাছে শ্রমিকের জীবন এখনো উপেক্ষিত?

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, দুর্ঘটনাটি ঘটে একটি পুরোনো LNG carrier-এর ভেতরে। জাহাজের ট্যাংক বা বদ্ধ অংশে জমে থাকা গ্যাস থেকেই দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক ও বদ্ধ স্থান সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করা, অক্সিজেনের মাত্রা পরীক্ষা করা, দাহ্য ও বিষাক্ত গ্যাস শনাক্ত করা এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অথচ এই মৌলিক নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রশ্নটিই এখন পুরো ঘটনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না; তবে এতগুলো প্রাণহানির পর নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখা অপরিহার্য।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- একটি জাহাজ কাটার আগে সেটি সত্যিই নিরাপদ ছিল কি না, তা কে নিশ্চিত করেছিলেন? কে গ্যাস পরীক্ষা করেছিলেন? কোন কর্মকর্তা কাজের অনুমতি দিয়েছিলেন? বদ্ধ স্থানে শ্রমিক প্রবেশের আগে প্রয়োজনীয় ‘পারমিট টু ওয়ার্ক’ দেওয়া হয়েছিল কি না? দুর্ঘটনার সময় প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল ও প্রয়োজনীয় শ্বাস-প্রশ্বাসের সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুত ছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তরই হয়তো বলে দেবে এটি নিছক একটি দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে ছিল ধারাবাহিক নিরাপত্তা অবহেলা।

শিপ রিসাইক্লিং কোনো সাধারণ লোহার কাঠামো কাটার কাজ নয়। একটি পরিত্যক্ত জাহাজের ট্যাংক, পাইপলাইন, কার্গো হোল্ড, ফুয়েল সিস্টেম ও বদ্ধ কক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ধরনের দাহ্য, বিষাক্ত কিংবা অক্সিজেন-স্বল্প পরিবেশ তৈরি হতে পারে। বাইরে থেকে কোনো গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে না, এমন ধারণা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। আবার একবার পরীক্ষা করে গ্যাস পাওয়া যায়নি বলেই পরবর্তী সময়ে গ্যাস জমবে না, এমন নিশ্চয়তাও নেই। তাই প্রতিটি ধাপে পুনরায় গ্যাস পরীক্ষা, বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং অনুমোদিত নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আবশ্যক।

বাংলাদেশে এ খাতের জন্য আইন ও বিধিমালা নেই- এমন নয়। শিপ রিসাইক্লিং-সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালায় শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। ২০২৫ সালের ২৬ জুন থেকে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের Hong Kong Convention কার্যকর হয়েছে, যেখানে জাহাজ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে শ্রমিকের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, জরুরি প্রস্তুতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো; আইন, বিধিমালা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থাকার পরও যদি একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটে, তবে সমস্যা কি আইনের অভাবে, নাকি আইন প্রয়োগের দুর্বলতায়?

এই ঘটনার ক্ষেত্রে আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ইয়ার্ডে এর আগেও নিরাপত্তাজনিত অনিয়মের অভিযোগ ও সংশোধনের নির্দেশনা ছিল। পরিদর্শন, পুনঃপরিদর্শন, নোটিশ এবং শেষ পর্যন্ত শ্রম আদালতে মামলার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার তথ্যও এসেছে। যদি এসব তথ্য সঠিক হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন; নিরাপত্তার ঘাটতি শনাক্ত হওয়ার পরও ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম কীভাবে চলতে থাকল? শুধু নোটিশ দেওয়া, জরিমানা করা কিংবা মামলা করাই কি যথেষ্ট? একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থায় গুরুতর ঘাটতি ধরা পড়লে ঝুঁকি দূর না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কাজ বন্ধ রাখার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে পরিদর্শন ব্যবস্থা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। নিরাপত্তার মূলনীতি হওয়া উচিত; দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি বন্ধ করা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘ক্লিয়ারেন্স’ বা নিরাপত্তা ছাড়পত্র। কোনো জাহাজ একসময় গ্যাসমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল কিংবা কোনো পর্যায়ে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল, এটিই পুরো জাহাজ কাটার কাজকে নিরাপদ প্রমাণ করে না। জাহাজ কাটার সঙ্গে সঙ্গে এর বিভিন্ন অংশের ঝুঁকির ধরনও পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পুনরায় পরীক্ষা, লিখিত রেকর্ড, অনুমোদন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাক্ষর থাকা দরকার। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ‘ধরে নেওয়া’ নয়, প্রয়োজন ‘পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া’।

তাহলে দায় কার? তদন্তের আগে কাউকে অভিযুক্ত করা নয়, বরং দায়ের প্রতিটি স্তর চিহ্নিত করা জরুরি। যদি নিরাপত্তা অবহেলা প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রথম দায় অবশ্যই মালিক ও পরিচালন কর্তৃপক্ষের। কারণ কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব নিয়োগকর্তার। পাশাপাশি নিরাপত্তা কর্মকর্তা, HSE টিম, কাজের অনুমোদনদাতা, ঠিকাদার ও সাব-ঠিকাদারদের দায়িত্বও তদন্তে খতিয়ে দেখতে হবে। একজন শ্রমিক কেন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রবেশ করলেন; এ প্রশ্নের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তাঁকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি কে দিলেন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন কে?

ঠিকাদারি ও সাব-ঠিকাদারি ব্যবস্থাও বিশেষভাবে নজরদারির দাবি রাখে। অনেক ক্ষেত্রে মূল প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন ঠিকাদারের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। এতে দায়িত্বের বিভাজন তৈরি হয়, কিন্তু দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সেই বিভাজন যেন দায় এড়ানোর সুযোগ না হয়ে ওঠে। মূল মালিক, ঠিকাদার ও সাব-ঠিকাদার; যে ব্যবস্থাতেই শ্রমিক নিয়োজিত থাকুন না কেন, নিরাপত্তার মান সবার জন্য একই হতে হবে।

(২য় অংশ)
সস্তা শ্রমের নামে সস্তা নিরাপত্তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সরকারের দায়িত্বও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমেই প্রয়োজন স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কারিগরি তদন্ত। শুধু প্রশাসনিক তদন্ত নয়; শিপ রিসাইক্লিং, অকুপেশনাল সেফটি, গ্যাস ও রাসায়নিক ঝুঁকি, শ্রম আইন, পরিবেশ ও অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্তে শুধু দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ নয়; এর পেছনে কোনো প্রশাসনিক, ব্যবস্থাপনাগত বা নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা ছিল কি না, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে সীতাকুণ্ডের সব শিপইয়ার্ডে জরুরি ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ Safety Audit পরিচালনা করা দরকার। কাগজপত্র ঠিক আছে কি না তা নয়; বাস্তবে গিয়ে গ্যাস পরীক্ষার যন্ত্র, ভেন্টিলেশন, বদ্ধ স্থানে প্রবেশের ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা ও অগ্নিনিরাপত্তা পরীক্ষা করতে হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ‘Permit to Work’ ব্যবস্থা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। কোন শ্রমিক কখন কোন ট্যাংক বা বদ্ধ স্থানে প্রবেশ করলেন, তার আগে কী কী পরীক্ষা করা হলো, অক্সিজেন ও গ্যাসের মাত্রা কত ছিল, কে অনুমোদন দিলেন; এসবের লিখিত ও সম্ভব হলে ডিজিটাল রেকর্ড থাকা উচিত। কোনো প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করলে শুধু নোটিশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ, লাইসেন্স বা অনুমোদন পুনর্মূল্যায়ন এবং আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ একটি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যে সিদ্ধান্ত আজ নেওয়া যায়, তা কাল একজন শ্রমিকের জীবন বাঁচাতে পারে।
মালিকপক্ষেরও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন প্রয়োজন। নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত ব্যয় নয়; এটি ব্যবসা পরিচালনার অপরিহার্য অংশ। প্রতিটি জাহাজের জন্য আলাদা ঝুঁকি মূল্যায়ন, Hazardous Material Inventory, গ্যাস পরীক্ষা, বদ্ধ স্থানে প্রবেশের কঠোর নিয়ম, প্রশিক্ষিত HSE টিম এবং জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা থাকা উচিত। শ্রমিক যদি কোনো স্থানে ঝুঁকি অনুভব করেন, তাহলে ‘কাজ বন্ধ হয়ে যাবে’ এই ভয়ে যেন তাঁকে সেখানে যেতে বাধ্য করা না হয়। একজন শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে আপত্তিকে উৎপাদন ব্যাহত করার কারণ হিসেবে না দেখে সেটিকে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার আগাম সংকেত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শ্রমিকদেরও নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, সব দায় শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশিক্ষণ ছাড়া বদ্ধ ট্যাংকে প্রবেশ করা উচিত নয়। গ্যাসের গন্ধ, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, চোখ জ্বালা কিংবা অস্বাভাবিক পরিবেশ অনুভূত হলে সঙ্গে সঙ্গে কাজ বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত কোনো সহকর্মীকে উদ্ধারের জন্য প্রশিক্ষণ ও উপযুক্ত শ্বাস-সুরক্ষা ছাড়া হঠাৎ ভেতরে ঢুকে পড়া যাবে না। এতে প্রথম দুর্ঘটনার পর দ্বিতীয় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এবং উদ্ধার করতে গিয়ে আরও প্রাণহানি ঘটার আশঙ্কা থাকে।
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক থাকার যে তথ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা দরকার। যদি বয়সের তথ্য সঠিক হয়, তাহলে বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পে অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক কীভাবে কাজ করছিলেন, কে তাঁকে নিয়োগ দিয়েছিল এবং বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছিল কি না, এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন। শিপব্রেকিং এমনিতেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ; সেখানে বয়স, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও স্বাস্থ্যগত সক্ষমতা যাচাই ছাড়া কাউকে কাজে নিয়োগ দেওয়া আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা এসেছে। এটি অবশ্যই মানবিক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। কিন্তু ক্ষতিপূরণ কখনোই একজন স্বজনের জীবনের বিকল্প নয়। একটি পরিবার তার উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে যে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়ে, কয়েক লাখ বা কয়েক কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দিয়েও সেই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই ক্ষতিপূরণ প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা করা, যাতে পরবর্তী পরিবারটির কাছে ক্ষতিপূরণ নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনই না পড়ে।
শিপ রিসাইক্লিং বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাত। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, দেশের ইস্পাতশিল্পের কাঁচামালের বড় একটি উৎস জোগায় এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখে। তাই দুর্ঘটনা ঘটছে বলে পুরো শিল্প বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন নিরাপদ, আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও শ্রমিকবান্ধব শিপ রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তোলা। বিশ্ব যখন নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশকেও কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব অর্থেই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।
সীতাকুণ্ডের এই মর্মান্তিক ঘটনায় তাই শুধু শোক প্রকাশ, তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে, দায় নির্ধারণ করতে হবে এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে হবে। একই সঙ্গে সীতাকুণ্ডের প্রতিটি শিপইয়ার্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ আমরা বারবার দেখেছি- দুর্ঘটনা ঘটে, প্রাণহানি হয়, তদন্ত কমিটি হয়, ক্ষতিপূরণ ঘোষণা হয়, কিছুদিন আলোচনা চলে; তারপর আবার সবকিছু আগের মতো চলতে থাকে। এই চক্র এবার ভাঙতেই হবে।
শ্রমিকের জীবন কোনো পরিসংখ্যান নয়, কোনো উৎপাদন খরচও নয়। একটি শ্রমিক যখন সকালে পরিবারের মুখে হাসি রেখে কর্মস্থলে যান, তখন তাঁর নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসার নিশ্চয়তা দেওয়া মালিকপক্ষের মানবিক ও আইনগত দায়িত্ব; একই সঙ্গে সেটি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডে ঝরে যাওয়া ৯টি প্রাণের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা হবে তখনই, যখন এই মৃত্যুকে আরেকটি ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে ভুলে না গিয়ে এর কারণ, দায় ও ব্যর্থতার প্রতিটি স্তর চিহ্নিত করে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে; যাতে আগামী দিনে আর কোনো শ্রমিককে বিষাক্ত গ্যাস, আগুন, বিস্ফোরণ কিংবা অবহেলার কাছে জীবন হারাতে না হয়।
নিরাপত্তা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; নিরাপত্তাই হোক শিপ রিসাইক্লিং শিল্পের প্রথম শর্ত।

লেখক পরিচিতি: কলাম লেখক ও সংগঠক ।

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
কপিরাইট © ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট