1. news@dainikchattogramerkhabor.com : Admin Admin : Admin Admin
  2. info@dainikchattogramerkhabor.com : admin :
শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:০২ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
লন্ডনে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘চট্টগ্রাম উৎসব ২০২৬’ ও গুণীজন সম্মাননা ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে সনদ পেলেন এম.এইচ.সোহেল বোয়ালখালীতে মসজিদের মাইকের মেশিন চুরি আগাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় তরুণদের নেতৃত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে: ডা. শাহাদাত চিটাগং ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে স্পেলিং বি ও স্টোরি টেলিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি নির্বাচিত ভূজপুর থানার অফিসার ইনচার্জ বিপুল চন্দ্র দে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সম্মেলনে যোগ দিতে পোল্যান্ড সফরে অধ্যাপক সুমেধানন্দ মহাথেরো নিষিদ্ধ সংগঠন কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে জাতীয় জেলহত্যা দিবস পালিত- মারকাযুল কুরআন ওয়াসসুন্নাহ একাডেমির হিফজুল কুরআন বিভাগের সবকদান অনুষ্ঠান সম্পন্ন হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশনের প্রতিযোগিতায় আত-তানযীল ইনস্টিটিউটের কৃতিত্ব

বাইশে শ্রাবণ: মানুষের হৃদয়ে চিরজাগরূক রবীন্দ্রনাথ – লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া

  • সময় শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৫১ পঠিত

 

শ্রাবণের আকাশে যখন কৃষ্ণমেঘের ঘনঘটা নামে, বৃষ্টিধারা নীরবে ধরণীকে স্নাত করে, তখন বাঙালির হৃদয়েও নেমে আসে এক গভীর বিষাদের সুর। কারণ এই শ্রাবণেরই বাইশতম দিনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণপুরুষ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নশ্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অনন্তের পথে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই প্রস্থান কোনো সমাপ্তির গল্প নয়; বরং এক চিরন্তন উপস্থিতির সূচনা। তিনি দেহে বিদায় নিয়েছেন, অথচ তাঁর সৃষ্টি, দর্শন ও মানবতার দীপ্তি আজও সমান উজ্জ্বল। তাই বাইশে শ্রাবণ কেবল শোকের দিন নয়; এটি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, আত্মজাগরণ এবং রবীন্দ্রচেতনাকে নতুন করে ধারণ করার এক অনন্য প্রেরণার দিন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অনন্য প্রতিভা, সৃজনশীল মনন ও বিশ্বমানবতার চেতনায় বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসভায় এক অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, শিক্ষাচিন্তা, দর্শন ও চিত্রকলা; সৃজনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর বিস্ময়কর অবদান বাংলা সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ, আর বিশ্বমানবতার সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারকে করেছে আরও ঋদ্ধ। তাঁর সৃষ্টি কেবল বাংলা ভাষা বা বাঙালি জাতির সম্পদ নয়; এটি সমগ্র মানবসভ্যতার চিরন্তন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল আলোকস্তম্ভ।
তিনি লিখেছিলেন, “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।” এই অমর পঙ্ক্তিতে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর জীবনদর্শনের মর্মবাণী। তিনি এমন এক সমাজ ও বিশ্বের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষের চিন্তা হবে মুক্ত, জ্ঞান হবে অবাধ, সংকীর্ণতার প্রাচীর হবে ভেঙে চুরমার, আর মানবতা, সত্য ও ন্যায়বোধ হবে সভ্যতার সর্বোচ্চ ভিত্তি। তাঁর এই স্বপ্ন আজও আমাদের পথ দেখায়, বিবেককে জাগ্রত করে এবং একটি আলোকিত সমাজ নির্মাণের অনুপ্রেরণা জোগায়।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয় তার মনুষ্যত্বে। তাই তাঁর সাহিত্য কখনো বিভাজন বা বিদ্বেষের ভাষা উচ্চারণ করে না; বরং ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সৌন্দর্যবোধ ও বিশ্বমানবতার চেতনাকে জাগ্রত করে। তাঁর সৃষ্টিতে যেমন প্রকৃতির অনুপম সৌন্দর্য অনির্বচনীয় মাধুর্যে ধরা দিয়েছে, তেমনি মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, আশা-নিরাশা, আনন্দ-বেদনা, সংগ্রাম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও গভীর মানবিকতা এবং শিল্পসুষমায় রূপ লাভ করেছে। সেই কারণেই তাঁর সাহিত্য কেবল পাঠের বিষয় নয়; এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি, জীবনবোধ ও মানবিক বিকাশের এক চিরন্তন আলোকধারা।
১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বসভায় এক অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। তাঁর রচিত “আমার সোনার বাংলা” ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল। বাংলার মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি অকৃত্রিম প্রেম এবং জাতীয় চেতনাকে জাগিয়ে তোলার এই গানই স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। অন্যদিকে, তাঁরই রচিত “জন গণ মন” ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে একই কবির রচিত দুটি গান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এক অনন্য ও গৌরবময় দৃষ্টান্ত, যা তাঁর সৃষ্টিশক্তির সর্বজনীনতা ও বিশ্বজনীন আবেদনকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মৃত্যু সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গভীর, উদার ও জীবনমুখী। তিনি লিখেছিলেন, “মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান।” এই অমর উচ্চারণে মৃত্যুভয় নয়, বরং জীবনের পূর্ণতা, অনন্তের প্রতি আত্মসমর্পণ এবং চিরসুন্দরের সঙ্গে মিলনের এক অপূর্ব দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। তাই তাঁর নিজের মহাপ্রয়াণও যেন তাঁরই জীবনদর্শনের বাস্তব প্রতিফলন। আজকের পৃথিবী যখন হিংসা, অসহিষ্ণুতা, বিভাজন ও মূল্যবোধের সংকটে নানাভাবে বিপর্যস্ত, তখন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, দর্শন ও মানবতাবাদ আমাদের নতুন করে আলোর পথ দেখায়। তাঁর শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- সভ্যতার প্রকৃত শক্তি অস্ত্রে নয়, মানবতায়; প্রতিযোগিতায় নয়, সহমর্মিতায়; ঘৃণায় নয়, ভালোবাসায়। তাই বাইশে শ্রাবণ কেবল একজন কবির মহাপ্রয়াণের স্মরণদিবস নয়; এটি রবীন্দ্রচেতনাকে আত্মস্থ করারও এক মহামূল্যবান উপলক্ষ। তাঁর সৃষ্টিকে গভীরভাবে পাঠ করা, তাঁর মানবতাবাদকে জীবনের অনুশীলনে রূপ দেওয়া এবং তাঁর মুক্তচিন্তার আলো আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হতে পারে বিশ্বকবির প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
রবীন্দ্রনাথ দেহে অনুপস্থিত, কিন্তু তিনি আজও বেঁচে আছেন প্রতিটি বাংলা উচ্চারণে, প্রতিটি রবীন্দ্রসংগীতে, প্রতিটি কবিতার অনুভবে এবং প্রতিটি মানবিক স্বপ্নে। মানুষের জীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু, প্রেম থেকে বিরহ, আনন্দ থেকে বেদনা, পূজা থেকে প্রকৃতি, দেশপ্রেম থেকে বিশ্বমানবতা- জীবনের প্রায় প্রতিটি অনুভূতি, উপলক্ষ ও অনুষঙ্গকে তিনি তাঁর গান, কবিতা ও সাহিত্যে চিরন্তন শিল্পরূপ দিয়েছেন। তাই জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি ঋতুতে, প্রতিটি আবেগে বাঙালি ফিরে যায় রবীন্দ্রনাথের কাছে। যতদিন বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে, ততদিন রবীন্দ্রনাথও বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির অমলিন আলোয়, মানুষের হৃদয়ের অনিঃশেষ প্রেরণা হয়ে। বাইশে শ্রাবণে তাঁর পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর অমর বাণী আমাদের চিত্তকে ভয়শূন্য করুক, বিবেককে জাগ্রত করুক এবং সত্য, সৌন্দর্য ও মানবতার আলোকময় পথে চলার অনুপ্রেরণা জোগাক চিরকাল। এটাই হবে বিশ্বকবির প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও প্রকৃত প্রণাম।

লেখক পরিচিতি: কলাম লেখক ও সংগঠক; ডিস্ট্রিক্ট সেক্রেটারী, লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল, ডিস্ট্রিক্ট ৩১৫-বি৪, বাংলাদেশ।

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
কপিরাইট © ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট