
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নিজ হাতে গড়ে তোলা বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিতে নতুন দায়িত্ব; ৫৪ বছরের ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনীর দাবি।
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ১৩ নং আবদার বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নবনির্বাচিত সহ-সভাপতি হয়েছেন বিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক আলহাজ্ব মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান মাস্টার। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন, শিক্ষা বিস্তারে অবদান এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই প্রবীণ শিক্ষকের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তিতে আনন্দিত তাঁর সাবেক শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও এলাকাবাসী।
আলহাজ্ব মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান মাস্টার বর্তমানে হাজেরা মেমোরিয়াল মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং মাদবর বাড়ী মোহাম্মদীয়া কওমী মাদ্রাসা ও এতিমখানার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি তেলিহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসর গ্রহণ করেন। শিক্ষকতা জীবনের শুরুর দিকে তিনি ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার পাখিরচালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রেখে চলেছেন।
১৯৭২ সালে স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে ১৩ নং আবদার বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে বাঁশ সংগ্রহসহ নানা সহযোগিতার মাধ্যমে এলাকাবাসী এগিয়ে আসেন। নিজেদের শ্রম, সময় ও অর্থ দিয়ে যাঁরা বিদ্যালয়টি গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদের মধ্যে চারজন প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁরা হলেন—বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোঃ মোছলেহ উদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোঃ সাখাওয়াত হোসেন, আলহাজ্ব মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান মাস্টার এবং আলহাজ্ব মোঃ আব্দুল কাদির মাস্টার।
প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোঃ মোছলেহ উদ্দিন। তিনি তেলিহাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দীর্ঘদিন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। অপর প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোঃ সাখাওয়াত হোসেন ২০২৬ সালে ইন্তেকাল করেন। প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক আলহাজ্ব মোঃ আব্দুল কাদির মাস্টার বর্তমানে অসুস্থ। তাঁর সুস্থতার জন্য এলাকাবাসীর কাছে দোয়া কামনা করা হয়েছে।
আলহাজ্ব মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান মাস্টার একসময় এ বিদ্যালয়ে শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে পরিচালনা কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে তেলিহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব হিসেবেও কাজ করেছেন। দীর্ঘদিন পর নিজ হাতে গড়ে তোলা বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিতে সহ-সভাপতির দায়িত্ব পাওয়া তাঁর শিক্ষকতা জীবনের সঙ্গে এক আবেগঘন অধ্যায় যুক্ত করেছে।
বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোঃ মোছলেহ উদ্দিনের ছেলে এবং আলহাজ্ব মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান মাস্টারের সাবেক শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব আশরাফুল জান্নাত হ্যাপি। কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি ও সদস্য-সচিব ছাড়া অধিকাংশ সদস্যই বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী—যা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে প্রজন্মের সম্পর্কের একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় বহু গুণী ব্যক্তি ও সমাজসেবকের অবদান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে মরহুম ইয়াকুব আলী, আলহাজ্ব আবদুল আউয়াল ব্যাপারী, মরহুম আছমত আলী মেম্বার, মরহুম আবদুল কাদির প্রধান (লেচু মেম্বার), মরহুম কাছুম আলী, মরহুম হাছেন আলী মাদবর, মরহুম সূর্যত আলী মাদবরসহ আরও অনেকে উল্লেখযোগ্য। বিদ্যালয়ের জমি দানে মরহুম আছমত আলী মেম্বার ও তাঁর পরিবারের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর বড় ছেলে উসমান গণি খোকা বর্তমানে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির দাতা সদস্য এবং ছোট ছেলে তারেক হাসান বাচ্চু পদাধিকারবলে কমিটির সদস্য।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও আয়কর আইনজীবী এস এম তোফাজ্জল হোসেন বলেন, “আমার বাবা আলহাজ্ব মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান মাস্টার এই বিদ্যালয়ের একজন প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক। আমিও এ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। বাবার শিক্ষকতা জীবনের স্মৃতি ও অবদানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিতে তাঁর নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তি আমাদের পরিবারের পাশাপাশি প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর জন্যও আনন্দের।”
তিনি আরও বলেন, “বিদ্যালয়ের ১৯৭২ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সব ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি বৃহৎ পুনর্মিলনী আয়োজনের জন্য আমি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির কাছে প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা সাবেক শিক্ষার্থীরা এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক ও সমাজের অবদান রাখা ব্যক্তিদের যথাযথ সম্মান জানানো প্রয়োজন।”
তিনি প্রস্তাব করেন, বিদ্যালয়ের জীবিত তিন প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষককে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান এবং প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোঃ সাখাওয়াত হোসেনকে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হোক। একই সঙ্গে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা প্রয়াত সমাজসেবক ও জমিদাতাদের স্মরণে বিশেষ আয়োজন করা যেতে পারে।
বিদ্যালয়টি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি আবদার ও আশপাশের এলাকার বহু প্রজন্মের শিক্ষা, স্মৃতি ও শেকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহ্য। প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষকদের অবদান সংরক্ষণ, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের একত্র করা এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়নে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রত্যাশা এলাকাবাসী।
Leave a Reply