
আমরা বাঙালি, আমরা বীরের জাতি। ভাষার অধিকার থেকে স্বাধীনতা—প্রতিটি সংগ্রামে বাঙালি জাতি সাহস, ত্যাগ ও আত্মমর্যাদার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু বিদেশের মাটিতে কর্মরত লাখো বাংলাদেশির জীবন, নিরাপত্তা ও জীবিকার প্রশ্নে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কতটুকু—এ প্রশ্ন আজ নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
প্রবাসীর শ্রমে সমৃদ্ধ দেশ, সংকটে পাশে কে?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি কঠোর পরিশ্রম করে দেশে অর্থ পাঠান। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সে সচল থাকে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, চলে পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়া ও মা-বাবার চিকিৎসা। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতেও তাঁদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু যাঁদের শ্রম ও ঘামে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হয়, তাঁদের জীবন যখন বিদেশের মাটিতে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কার? শুধু পরিবার, নাকি রাষ্ট্রেরও রয়েছে সুস্পষ্ট দায়িত্ব?
মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত কিংবা নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে থাকেন সেখানে কর্মরত সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। আঞ্চলিক উত্তেজনা, হামলা-পাল্টা হামলা কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যে অস্থিরতার প্রভাব কর্মসংস্থানের ওপর পড়লে প্রবাসীদের আয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কেউ হারাতে পারেন চাকরি, কেউ পড়তে পারেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে। আবার নিরাপত্তার কারণে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হলে ঋণ, সংসারের ব্যয় ও পরিবারের দায়িত্ব তাঁদের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায়।
সংকটে প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি
একজন প্রবাসী কর্মী বিদেশে যাওয়ার জন্য জমি বিক্রি করেন, ঋণ নেন কিংবা পরিবারের শেষ সম্বলটুকু ব্যয় করেন। তাঁর স্বপ্ন থাকে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। অথচ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান হারালে সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে পড়তে পারে।
তাই প্রবাসীদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু তাঁদের বিদেশে পাঠানো কিংবা রেমিট্যান্স আহরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা, শ্রম অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
এ ক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট দূতাবাস এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য দেওয়া, জরুরি হটলাইন সচল রাখা, নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং প্রয়োজন হলে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে কর্মহীন হয়ে দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসন, দক্ষতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান, সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। বিদেশে উপার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করে যাঁরা দেশে নতুন করে জীবন শুরু করতে চান, তাঁদেরও কার্যকর সহযোগিতা দেওয়া প্রয়োজন।
রেমিট্যান্স নয়, প্রবাসীর জীবনও গুরুত্বপূর্ণ
প্রবাসীদের অবদান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু রেমিট্যান্সের পরিমাণ দিয়ে তাঁদের গুরুত্ব নির্ধারণ করা যায় না। তাঁরা প্রত্যেকে একজন মানুষ, একটি পরিবারের আশ্রয় এবং অসংখ্য স্বপ্নের বাহক। তাঁদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা তাই কেবল অর্থনৈতিক বিবেচনার বিষয় নয়; এটি মানবিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রশ্ন।
এ দায়িত্ব পালনে প্রবাসীদেরও সচেতন হতে হবে। বিদেশে যাওয়ার আগে বৈধ কাগজপত্র, নিয়োগচুক্তি, কর্মস্থলের নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের জরুরি যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, রিক্রুটিং এজেন্সি ও নিয়োগকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো কর্মী প্রতারণা, বঞ্চনা কিংবা অনিরাপদ কর্মপরিবেশের শিকার না হন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব রয়েছে—আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে নিরীহ মানুষ ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর জীবন যেন বিপন্ন না হয়, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের বাস্তব প্রতিফলন চাই
বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণনীতি হতে হবে প্রবাসীবান্ধব, মানবিক ও কার্যকর। প্রবাসীদের বিপদে দ্রুত সহায়তা, দূতাবাসের সেবার মানোন্নয়ন, আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ আদায়ে সহযোগিতা এবং দেশে ফেরত আসা কর্মীদের পুনর্বাসনে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে।
প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবেন, অথচ তাঁদের সংকটের সময়ে অসহায় হয়ে পড়তে হবে—এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়। রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
মনে রাখতে হবে, একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নয়; নাগরিকের বিপদে রাষ্ট্র কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তার মধ্যেও সেই শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়।
বীরের জাতি হওয়ার প্রকৃত পরিচয় শুধু সাহসী স্লোগানে নয়, মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও নিহিত। তাই প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদার হোক। সংঘাতের পরিবর্তে শান্তি, অনিশ্চয়তার পরিবর্তে নিরাপত্তা এবং অবহেলার পরিবর্তে দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠিত হোক।
প্রবাসীদের শ্রমে সমৃদ্ধ হোক বাংলাদেশ, আর তাঁদের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুক রাষ্ট্র।
লেখক:
মানবাধিকার ও সমাজকর্মী
দপ্তর সম্পাদক, চট্টগ্রাম জেলা, গ্রিন ফোর্স বাংলাদেশ।
Leave a Reply