
বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেনাপ্রধান, বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ধারণ করে থাকা ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও আদর্শিক উত্তরাধিকারের ধারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র কাজীর দেউড়িতে ৩ দশমিক ১৭ একর জায়গা নিয়ে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরটির অবস্থান। ১৯১৩ সালে ব্রিটিশরাজ তথা ভারত সম্রাট ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিনন্দন ইমারতটি নির্মাণ করেন। ব্রিটিশ আমলে এটি ‘লাট সাহেবের কুঠি’ নামে পরিচিত ছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্যাগোডা ধাঁচের স্থাপত্যশৈলীর প্রতীক হিসেবে নির্মিত ভবনটিতে একই সঙ্গে স্থানীয় বহুস্তরবিশিষ্ট টিনশেড ঘরবাড়ির নকশারও সাদৃশ্য রয়েছে। যা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সুন্দর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যগুলি উপস্থাপন করে। চারপাশের সবুজে ঘেরা এই স্থানটি নগরবাসীর কাছেও বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী এই ভবনটিতে ক্যাম্প স্থাপন করে এটিকে নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। সেখানে পাকিস্তানি সেনারা অসংখ্য নিরীহ বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই ভবনে প্রথম ১৯৭১সালের ১৭ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ভবনটি দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক নীরব সাক্ষী।
১১৩ বছরের পুরোনো এ স্থাপনাটি পরবর্তী সময়ে সার্কিট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এই ভবনে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে শহীদ হন। সে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী সময়ে ১৯৮১ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসকে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
১৯৯৩ সালের ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ভবনটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। জাদুঘর কর্তৃক সংস্কার ও উন্নয়ন কাজের জন্য তখন ভবনটির দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শেষে ওই বছর ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন করেন। বর্তমানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা জাদুঘর হিসেবে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর পরিচালিত হচ্ছে।
এখানে কিউরেটরিয়াল, প্রশাসন, নিরাপত্তা, লাইব্রেরি, প্রকৌশল, ডিসপ্লে ও হিসাব শাখা নিয়ে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। জাদুঘরে একটি গবেষণামূলক লাইব্রেরি, একশ আসনবিশিষ্ট একটি সেমিনার হল এবং দেড়শ আসনবিশিষ্ট একটি অডিটোরিয়াম রয়েছে। এ ছাড়া জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে ১৭টি গ্যালারিতে ৪২২টি নিদর্শন রয়েছে। যেখানে জিয়াউর রহমানের ব্যবহৃত চেয়ার-টেবিল, আয়না, জুতা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র, প্রকাশনা, উপহার সামগ্রী গ্যালারি গুলোতে রয়েছে। জিয়াউর রহমানের প্রথম জীবনের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার ডায়ারোমা (ত্রিমাত্রিক রেপ্লিকা), মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠ ও সেক্টর কমান্ডারদের ছবি, কালুরঘাট যুদ্ধের ছবি, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র, জিয়াউর রহমানের ব্যবহৃত পোশাক-ব্যাগ ও টুপি, বেশকিছু বিরল ছবি, খাল খনন কর্মসূচির রেপ্লিকা, রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিদেশ সফরের সময়ে বিভিন্ন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের দেওয়া উপহার, জিয়াউর রহমান সার্কিট হাউজে সেই রাতে যে কক্ষে ছিলেন সেটির খাট, টেবিল ও কার্পেট এবং রাঙ্গুনিয়ায় জিয়ানগরে যেখানে তাকে প্রথম দাফন করা হয় সেই কবরের ডায়ারোমাসহ বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে এ জাদুঘরে। ইতিহাসের স্বাক্ষী সবকিছুই সাজানো আছে।
জাদুঘরে সংরক্ষিত জিয়ার হাতে লেখা নোটগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো; ‘শুধু রাজনৈতিক দর্শনই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে অবশ্যই একটি আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি থাকতে হবে’; ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে হতে হবে বহির্বিশ্বমুখী’; ‘আমি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের জন্য যুদ্ধ করেছি’; ‘দল হবে জনগণভিত্তিক’ এবং ‘দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নে জনগণকে আর বিভ্রান্ত করা উচিত নয়’। রাজনৈতিক নেতা ও সুশীল সমাজের উদ্দেশে দেওয়া এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি এবং কৃষি বিপ্লবের মূল রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরেছিলেন।
যে দেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি বা ভিআইপিদের ভোগবিলাস ও অর্থ অপচয়ের নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত, সেখানে একজন রাষ্ট্রপতির অত্যন্ত সাদামাটা খাদ্যতালিকা যে কাউকেই বিস্মিত করে। ১৯৮১ সালের ২৯ মে থেকে ৩০ মে সকাল পর্যন্ত এই সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্য নির্ধারিত চূড়ান্ত খাদ্যতালিকাটি তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিখিতভাবে পাঠিয়েছিলেন। তালিকা অনুযায়ী দুপুরের খাবারে ছিল দুধ-চিনিসহ চা, পাউরুটি, মাখন, ভাজা মাছ ও চিপস, রোস্ট চিকেন, সবজি, ফ্রুট ককটেল এবং লেবু। রাতের খাবারে ছিল সাদা ভাত, চিকেন স্যুপ, পুডিং, মুরগির মাংস, মাটন দোপেঁয়াজা, ডাল ও সালাদ। এছাড়া বিকেলের নাশতায় ছিল দুধ-চিনিসহ ইস্পাহানী চা, হক ব্র্যান্ডের লবণযুক্ত বিস্কুট এবং লেবু।
জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে শুধু শহীদ রাষ্ট্রপতির স্মৃতিচিহ্নই নয়, বরং মহান মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের মাইক্রোফোন ও টেবিলের প্রতিরূপ (যেখান থেকে তৎকালীন মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেন), ১৯৭১ সালে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল স্মরণে মেজর জিয়ার ডাকঘর উদ্বোধনের প্রতিরূপ, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য, জেড ফোর্সের লেটারপ্যাড ও খাম, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মনোগ্রাম এবং মেজর জিয়ার সামরিক পোশাক। এসব থেকে নতুন প্রজন্ম ও রাজনৈতিক কর্মীরা তাঁর জীবনদর্শন ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারেন।
দর্শনার্থী, ইতিহাস গবেষক,লেখক, সাংবাদিক ও সাহিত্য প্রেমী মানুষ এখানে এসে সাবেক এই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত সাধারণ খাদ্যতালিকা, নিজ হাতে লেখা রাজনৈতিক নোট, বিভিন্ন বিষয়ে ব্যক্ত করা মতামত এবং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি দেখে বিস্মিত হন। এই জাদুঘরটি নতুন প্রজন্ম,শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার অনুসারী, ভক্ত ও রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য আদর্শচর্চা, ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগের অভাবেই স্থাপনাটি ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ বিগত সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কাজ ছিল না। এ কারণেই বর্তমানে জাদুঘরটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের একটি প্রভাবশালী মহল শহীদ রাষ্ট্রপতির স্মৃতি মুছে ফেলতে জাদুঘরটি বিলীন করার চেষ্টাও চালিয়েছিল। উল্লেখ্য যে গত বছরের ২ ডিসেম্বর ভূমিকম্পের প্রভাবে দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি সংলগ্ন দেয়ালের একটি অংশ ধসে পড়লে নিরাপত্তাজনিত কারণে কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ২০ মার্চ জাদুঘরটি পরিদর্শনকালে করেন- এ সময় তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই স্মৃতি সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় এটিকে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা (হেরিটেজ সাইট) হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান। এরপর গত ২৪ মার্চ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীও জাদুঘরটি পরিদর্শন করেন এবং এর বর্তমান অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন।
সম্প্রতি ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে জাদুঘরের সীমানাপ্রাচীর, রেস্ট হাউস, আনসার ব্যারাক সংস্কার ও রং করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি বাগানের সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে। মূল ভবনের পলেস্তারা খসে পড়া ও ছোট ছোট ফাটল মেরামতের জন্য বুয়েটের পরামর্শ অনুযায়ী দুর্বল অংশ অপসারণ করে নতুন করে পলেস্তারা দেওয়া হয়েছে। আরও কিছু সংস্কারকাজ চলমান।
শতবর্ষী এই স্থাপনাকে ‘ইতিহাসের স্মারক প্রতীক’ হিসেবে ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে এবং জনগণের আবেগের সঙ্গেও এটি গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলের সবচেয়ে বড় জাদুঘরই নয়, এটি শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গবেষণারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। জিয়া স্মৃতি জাদুঘর আমাদের গুরুত্বপূর্ণ হেরিটেজ প্রপার্টি। এটিকে সংরক্ষণ ও উন্নয়ন জরুরি। তাই অতিশীঘ্রই মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ধারক-বাহক জিয়া স্মৃতি জাদুঘর কালচারাল হেরিটেজ ঘোষণা এখনই সময়ের দাবী।
লেখকঃ কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।
মহাসচিব, শহীদ জিয়া রিসার্চ সেন্টার।
Leave a Reply