1. news@dainikchattogramerkhabor.com : Admin Admin : Admin Admin
  2. info@dainikchattogramerkhabor.com : admin :
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০১ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
ফটিকছড়ি জনকল্যাণ পরিষদের মাসিক সভা অনুষ্ঠিত। চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পার্কভিউ হসপিটালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম “শানে আউলিয়া ও বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর জীবন ও কর্ম ” -মাহমুদা মুশতারী বেকারত্ব দিন দিন যুব সমাজকে ছুরি-ছিনতাইয়ের পথে ঠেলে দিচ্ছে কৃষক, ক্ষুদ্রঋণ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তা: কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’: সাঁওতাল জীবন ও প্রতিবাদের গল্প নিয়ে নাটক পাহাড়তলী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুদকের ফাঁদ: ঘুষের টাকাসহ সাব-রেজিস্ট্রারসহ গ্রেফতার ৩ বোয়ালখালীতে মাদক সেবনের দায়ে ৩ জনের কারাদণ্ড র‍্যাগিং নয়, সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক হোক সম্মান, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের – লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া চট্টগ্রাম মেডিকেলে ইউনিট-২ চালুসহ ডেঙ্গু চিকিৎসা নিশ্চিতের দাবি

“শানে আউলিয়া ও বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর জীবন ও কর্ম ” -মাহমুদা মুশতারী

  • সময় বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৫ পঠিত
আল্লাহর নামে শুরু, অগণিত দরুদ ও সালাম তাঁরই প্রিয় হাবীব, সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ ইমামুল মুরসালিন রহমাতুল্লিল আলামীন দরবারে। আর মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব বা আশরাফুল মাখলুকাত যেমন আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন-“যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই সৃষ্টির সেরা।” (সুরা আল বাইয়্যিনাহ: আয়াত – ৭) তবে ,এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পেছনে ভূমিকা রয়েছে অসংখ্য নবী-রসূল , সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী, তবে-তাবেয়ীগণ ও আউলিয়ায়ে কেরামেরর , যাঁদেরকে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ হিকমত সহকারে প্রেরণ করেন এবং তন্মধ্যে বিবেক সম্পন্নগণ’ই আল্লাহ প্রদত্ত এই নেয়ামত’কে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে যুগে যুগে নিজেদের জ্ঞানের নিদর্শন পরবর্তী যুগের জন্য জীবনসংবিধান ও ইসলামী জগতের নতুন ধাপের সূচনা-স্বরূপ রেখে যান, যেমন পবিত্র কুরআনে এসেছে – ‘তিনি যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা (হিকমত) দান করেন, আর যাকে প্রজ্ঞা প্রদান করা হয়, তাকে নিশ্চয় প্রভূত কল্যাণ দান করা হয় এবং বিবেক সম্পন্নই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা বাকারাঃ ২/২৬৯)
সময়ের পরিক্রমায় দীনি দায়িত্ব নবী-রাসুল হতে সাহাবায়ে কেরাম, সাহাবায়ে কেরাম হতে তাবেয়ীগণ, তাবেয়ীগণ হতে তবে-তাবেয়ীগণ, এবং তবে-তাবেয়ীগণ হতে আউলিয়া কেরামের কাছে এসে ঠাঁই পায়,যা বর্তমানেও বহাল রয়েছে। যাঁদের হাত ধরে ইসলামের বিভিন্ন গভীর ধারা প্রতিনিয়ত উন্মোচন হয়ে আসছে।

আউলিয়ায়ে কেরামের শান:
আউলিয়ায়ে কেরাম আল্লাহ তায়ালার খাস বান্দা, যাঁদের অকল্পনীয় ও অসামান্য অবদানেই ইসলাম আজ বিশ্বের প্রত্যেক সীমানায় বিস্তৃত। আল্লাহর অলিগণের জ্ঞানই তাঁদেরকে অন্যান্য মানুষ থেকে আলাদা করে। অলিউল্লাহ শব্দের অর্থ হলো ‘আল্লাহর বন্ধু’, কুরআন ও হাদিসে তাঁদের উচ্চতম মর্যাদা ঘোষণা করা হয়েছে, যেমন আল্লাহ তায়ালার পবিত্র বাণীঃ “মনে রেখো যারা আল্লাহর বন্ধু (অলি), তাঁদের না কোনো ভয়-ভীতি আছে, না তাঁরা চিন্তান্বিত হবে, যাঁরা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছেন, তাঁদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে।” (সুরা ইউনুস : আয়াত ৬২- ৬৪]

অলি-আল্লাহগণ ইসলামের দীনি ভিত্তির উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং আল্লাহর স্মরণে ও ইসলামের আহ্বানে সর্বক্ষণ মশগুল থাকেন, যেমন পবিত্র কুরআনে এসেছে : “নিশ্চয়ই তোমাদের ওলি হলেন আল্লাহ এবং তাঁর রসূল আর ঈমানদার লোকেরা; যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহর প্রতি অনুগত, বাধ্যগত থাকে”, (সুরা মায়িদা : ৫৫) আর তাঁরা অপরকে ইসলামের প্রতি আগ্রহী করে তোলে, যেমন হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসঊড (রা.) বলেন- “তাঁরাই অলিউল্লাহ, যাঁদের কে দেখলে খোদার কথা স্মরণ হয়.” তবে কোনো অলীই ইসলামের বিধানের বাইরে নন, বরং তাঁরা সবাই ইসলামের আদর্শ অনুসরণ করেই নিজ জীবন’কে আদর্শস্বরূপ দুনিয়ায় কায়েম করেছেন, যেমন ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন : ‘যখন তুমি দেখবে কোনো লোক পানির উপর দিয়ে হাঁটছে অথবা শূণ্যে উড়ছে তখন তুমি তাকে অলী হিসেবে বিশ্বাস কর না, যতক্ষণ না তোমরা জেনে নিলে সে রসূলের অনুসরণ করে কি না’; ইসলামী জগতের গগনের এমনই এক উজ্জ্বলনক্ষত্র ও অনুকরণীয় আদর্শ হলেন সর্বযুগের গাউসুল আজম, অলি-উল্লাহ- আল সাইয়িদ মহিউদ্দিন আবু মুহাম্মদ আবুল কাদির জিলানী আল হাসানী ওয়াল হুসাইনী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)

পরিচিতি:
ইসলামের স্বর্ণযুগের উদঘাটনকারী ও গভীর অন্ধকার হতে জগতের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী, ইমামুল আউলিয়া, গাউসে পাক বড়পীর হযরত আব্দুল কাদির আল জিলানী (রহ.) ১লা রমজান ৪৭০ হিজরি মোতাবেক ২৩শে মার্চ, ১০৭৮ সনে বাগদাদ নগরের জিলান শহরে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পিতার নাম আবু সালেহ মুসা জঙ্গি দোস্ত এবং মাতার নাম উম্মুল খায়ের ফাতেমা। গাউসুল আজমের আসল নাম আব্দুল কাদির। মুসলিম সমাজকে চরম দুর্ভিক্ষকালে দ্বীনি আদর্শালোকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করা’ই তাঁকে ‘মহিউদ্দীন’ (দ্বীনের পুনরুজ্জীবনকারী) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

তাঁর কুনিয়ত বা উপনাম হলো, আবু মুহাম্মদ। বর্তমান ইরাকের অন্তর্গত জিলান শহরে জন্মগ্রহণ করায় তাঁর নামের সঙ্গে “জিলানী” সংযুক্ত করা হয়। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রে হতে জানা যায়, তিনি পিতা-মাতা উভয় দিক থেকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বংশধর ছিলেন, তাঁর পিতা ও মাতা ছিলেন যথাক্রমে সাইয়িদা শাবাব আহল আল-জান্নাহ‘ ইমাম হাসান ইবনে আলী (রা.) ও ইমাম হোসাইন ইবনে আলী (রা.)-র বংশধর, যার জন্যে বংশসূত্রস্বরূপ তাঁর নামে ‘আল হাসানী ওয়াল হুসাইনী’ যোগ করা হয়। তাঁর অগাধ দ্বীনি জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক পরিসীমায় অসাধারণ অবদানের জন্য তাঁকে ‘গাউসুল আজম’ (মহাসাহায্যকরী) ও ‘বড়পীর’ বলা হয়।বড়পীরের পূর্ণনাম ‘আস সাইয়িদ মহিউদ্দীন আবু মুহাম্মদ আব্দুল কাদির আল-জিলানী আল হাসানী ওয়াল হুসাইনী’-যেই নামের ছাপ অনুসরণ করে সময়ের সাথে সাথে আলেম সমাজ নিজেদের দ্বীনি যাত্রাপথ সুগম করেছে।

শৈশব ও কৈশোরকাল:
হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) শৈশব থেকেই ছিলেন অতুলনীয় জ্ঞানশক্তির অধিকারী এবং দ্বীনি ইলমের উচ্চ শিখায় কামেয়াব। তাঁর এই অনুপম মেধাশক্তিই হয়ে ওঠে পৃথিবীতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রধান সোপান। আপনি যেমন মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘আল্লাহ যার
ভালো চান,তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন‘[সহিহ বুখারী:৭১, মুসলিম শরীফ:১০৩৭]

শুভজন্মকালীন ঘটনা:
৪৭০ হিজরীতে বড়পীরের জন্মকালে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় সবাই রমজানের সাওম পালন করা আর না  করা নিয়ে সংশয়ে লিপ্ত ছিল।  সুবহে সাদিকের পূর্বে তিনি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে, নিয়মানুসারে দুগ্ধ ও মধু পান করেন, তবে সুবহে সাদিকের পরে তিনি মুখে আর কোনো অন্ন গ্রহণ করলেন না।অপরদিকে সংশয়ে থাকায় সকলে সেই দিনকে  ১লা রমজান ধরে সাওম পালন করে। সারাদিন বহুল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যখন শিশু আব্দুল কাদির কোনো পানাহার গ্রহণ করে না, সকলের মনে রীতিমতো দুশ্চিন্তার আভাস দেখা দেয়। পরিশেষে, মাগরিবের আজানের সময় তিনি দুগ্ধ পান করেন ,এতে সবার মাঝে স্বস্তি ফিরে এসে আসে। এই ঘটনার পরে সবার বিভ্রান্তি দূর হয় এবং তারা রমজান আরম্ভ হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়।এভাবেই জন্মের প্রথম দিন থেকে শুরু করে পূর্ণ একমাস শিশু আব্দুল কাদের সাওম পালন করেন; যা দেখে তৎকালীন সকলে উপলব্ধি করতে পারে যে, এই নবজাতক নিশ্চয়ই নিজের ভবিষ্যৎ জীবনে আল্লাহর এক বিশেষ মনোনীত ও পবিত্র পুরুষ এবং মহান কামেল ব্যক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন।

বেড়ে ওঠা:
তাঁর বেড়ে ওঠার পথচলায় সকলের এই উপলব্ধি দৃঢ় হতে থাকে। তাঁর আচার-আচরণ, চরিত্র, ব্যবহার—সবকিছুতেই প্রস্ফুটিত হত এক অনন্য মানবিক গুণাবলীর সমাহার ও চারিত্রিক দৃঢ়তার রূপ। তাঁর এইসব বৈশিষ্ট্য ও তাঁর ব্যক্তিত্ব চারপাশের সবাইকে মুগ্ধ করত এবং সবার মাঝে এক ইতিবাচক প্রভাব ফেলত।
তিনি যখন কৈশোরে পদার্পণ করেন, উচ্চ শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে তাঁর মা তাঁকে তৎকালীন উচ্চ শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বাগদাদে পাঠান।

বাগদাদ গমণকালের ঘটনা:
কাফেলায় যোগদানের পূর্বে, বিদায়বেলায় তাঁকে তাঁর মা সর্বাবস্থায় সত্য বলার উপদেশ দেন, এবং আর্থিক সম্বল হিসেবে ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা কাপড়ের ভেতরে সেলাই করে দেন। অতঃপর গাউসে পাক কাফেলায় অংশগ্রহণ করেন।যাত্রাপথে দুর্ভাগ্যবশত এক দল ডাকাত তাদের ঘেরাও করে, এবং খালি চোখে দৃশ্যমান সকল মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। এরপর যখন তারা যাত্রীদের আর কোনো অর্থ অবশিষ্ট আছে কিনা জিজ্ঞেস করে, তখন বালক আব্দুল কাদের বলে ওঠে, “আমার কাছে ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা আছে।” ডাকাতেরা প্রথমে রসিকতা মনে করে হেসে উড়িয়ে দেয়।ডাকাতদের সর্দার তাঁকে পুনরায় প্রশ্ন করে, “তোমার স্বর্ণমুদ্রাগুলি কোথায়?” তিনি উত্তর দিয়ে বলেন, “আমার মা আমার কাপড়ের ভেতরে সেলাই করে দিয়েছে।” এবং নিজের কাপড়ের সেলাই খুলে স্বর্ণগমুদ্রা বের করেন।ডাকাতদল তাঁর এই আচরণে বিস্মিত হয়ে যায়।যেখানে সকলে নিজেদের অর্থ রক্ষা করার চেষ্টা করে, সেখানে এই বালক নির্দ্বিধায় সত্য কথা বলে দেয়। তাঁর এমন আচরণ ও সৎ চরিত্র দেখে তৎক্ষণাৎ সেফ ডাকাতদলের সর্দার দলসহ অসৎ পথ থেকে তওবা করে সুপথে ফিরে আসে। এভাবেই, গাউসুল আজম আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) বাল্যকাল থেকেই নিজের চারপাশে এক মহিমাময় পরিবেশের সৃষ্টি করতেন।

জ্ঞানর্জন ও শিক্ষাজীবন:
গাউসুল আজম বড়পীর (রহ.) ছিলেন অঢেল ও অপ্রতীম জ্ঞান ও প্রখর মেধার অধিকারী। মাত্র ৫ বছর বয়সে পিতৃহীন হওয়ায় তাঁর প্রাথমিক জ্ঞানার্জন শুরু হয় নিজের জন্মভূমি জিলানী নগরে। মাতা উম্মুল খায়ের ও নানা আব্দুল্লাহ ছওমায়ীর হাত ধরে। তাঁদের তত্ত্বাবধানে তিনি প্রাথমিক জ্ঞানার্জন করেন। উচ্চশিক্ষার অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি বাগদাদ গমন করেন, যেখানে, তাঁকে এক মক্তবে ভর্তি করানো হয় এবং সেই মক্তবের মাধ্যমে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানার্জনের সূচনা হয়।
মক্তবের প্রথম দিনই তিনি পবিত্র কুরআন মাজিদের  প্রথম ১৮ পারা থেকে মুখস্থ তেলাওয়াত করে শোনান, তাঁর শিক্ষক বিস্মিত হয়ে যান, ‘কোনো ছাত্র মক্তবে প্রথম দিনেই কীভাবে আল্লাহর মহান বাণীগ্রন্থের বৃহৎ অংশ মুখস্থ করতে পারে?  এ ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে, তিনি জবাবে বলেন, ‘আমি গর্ভে থাকাকালীন আমার মা পবিত্র কুরআন হতে তেলাওয়াত করতেন, এবং আমি আমার মা থেকে শুনে শুনে গর্ভে থাকাবস্থায়ই মহান কুরআনুল কারীমের অর্ধেকের চেয়ে বেশি মুখস্থ করি।

গাউসে পাক আবারো নিজের অপ্রতীমতা প্রমাণ করেন। পরবর্তীতে তিনি উক্ত মক্তব হতে অবশিষ্ট ১২ পারা মুখস্থ করে, কুরআন হিফজ পরিপূর্ণ করেন।
বাগদাদের বিভিন্ন প্রসিদ্ধ ও মক্তব ও মাদ্রাসা হতে তিনি ইসলামের প্রাথমিক নিয়মনীতি, আরবি ভাষার ব্যাকরণ ও নীতিমালা এবং ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানলাভ করেন। বাগদাদের বিভিন্ন প্রসিদ্ধ ও প্রখ্যাতিবান মুহাদ্দিস হতে তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও তাসাউফ এর জ্ঞান লাভ করেন এবং ইলমে উচ্চ সনে পৌঁছান।

কর্ম:
গাউসুল আজম বড়পীর ছিলেন সর্বযুগের অন্যতম সুফি-সাধক ও অলিউল্লাহ এবং কাদেরিয়া তরিকতের প্রবর্তক। তিনি তাঁর দীনি ইলম ও আল্লাহ  প্রদত্ত বিশেষ প্রজ্ঞার সৎ ব্যবহার করে সর্বক্ষণ মানবসেবায় নিয়োজিত থাকতেন এবং বিশ্বের সর্বত্র ইসলাম ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে সাধনা করতেন। তিনি তাঁর জীবনকালে মানবজাতিকে হেদায়াত করার এবং সঠিক পথ নির্দেশনা এবং শিক্ষাদানের জন্য অসংখ্য কিতাব রচনা করেছেন, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-কিতাব সিরর আল-আসরার ওয়া মাযহাব আল-আনওয়ার, ফুতুহ আল গায়েব, জান্নাত ও জাহান্নামের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা ও গুনিয়াতুল তালেবিন ইত্যাদি।

বিভিন্ন মাহফিলে তিনি ইসলামের আদর্শ যুক্তিতপূর্ণ ভাষায় বর্ণনা করতেন। তাঁর ওয়াজ-নসিয়ত শুনতে দূর-দূরান্ত হতে তাঁর ভক্তরা উপস্থিত হতো। এমনকি অমুসলিম ও সমাবেশে অংশগ্রহণ করতো এবং তাঁর কথার ইতিবাচক প্রভাবে ইসলাম গ্রহণ করত। তিনি তাঁর হায়াতকালে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ও সাধনার মাধ্যমে ইসলামকে বিশ্বের কাছে উচ্চমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন।

তরিকতে অবদান:
সুলতানুল মশায়েখ, পীরে লাসানী, গাউসুল আজম দস্তগীর, বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) ছিলেন “কাদেরিয়া” তরিকতের প্রবর্তক। তিনি জীবনের ২৫ বছর বাগদাদের এক মরুভূমিতে গভীর মনোনিবেশ করে অতিবাহিত করেন। এবং গায়েবী ইলম অর্জন করেন। এই ইলমের প্রয়োগ তিনি তাঁর ত্বরিকতের নীতিমালায় প্রস্ফুটিত করেন। তাঁর এই মহৎ পদক্ষেপ দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ত্বরিকতকে তাঁর ভক্তরা তাঁর ওফাতের পরও অভ্যাহত রাখে। এই ত্বরিকতের অনুসারী আজও পৃথিবীর চতুর্দিকে ছড়নো।

কয়েকটি কারামাতের চম্বুকাংশ:
আউলিয়াগণের দ্বারা সংঘটিত অলৌকিক ঘটনাকে কারামত বলে, যা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নির্দেশে সংঘটিত হয়। গাউসে পাকের জীবনের অনেক কারামাত রয়েছে। তন্মধ্যে- (ক) অধিক প্রসিদ্ধ হলো মৃতকে জীবনদান। একদা তিনি তাঁর এক ভক্তের বাড়ির উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করছিলেন, যাত্রাপথে তিনি এক বুড়িকে সমুদ্রপাড়ে বসে অঝড়ে কাঁদতে দেখলেন । তিনি সেই মহিলার কাছে গিয়ে  জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হয়েছে বুড়ি মা? আপনি কাঁদছেন কেন?” জবাবে বুড়ি মা বলেন, “এই প্রশ্নের জবাব গত ১২ বছর ধরে দিয়ে আসছি, কোনো লাভ হয়নি, তাই এখন আর দিতে ইচ্ছে করে না।” জিলানী বলেন, “আমাকে বলুন, দেখি কিছু করতে পারি কিনা।” বুড়ি মা বলতে শুরু করেন, “আজ থেকে ১২ বছর আগে, আমার ছেলে ও তার নববধূ বরযাত্রীসহ এই রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরছিল, হঠাৎ এক তুমুল ঝড় এসে তাদের সমুদ্রের গভীর স্রোতে তলিয়ে নিয়ে যায়। বার্ধক্যে এই ছেলেই ছিল আমার শেষ সম্বল, তাই যখন তার কথা মনে পড়ে, এই সমুদ্রতীরে এসে কাঁদি।” তার কথা শুনে, গাউসুল পাকের করুণা হয়, তিনি বুড়িকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, “আমি ফিরিয়ে আনব আপনার সন্তানকে।” এরপর তিনি গায়েবী সূত্রে, আল্লাহ্ তায়ালার কাছে বৃদ্ধার সন্তানকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ফরিয়াদ করেন।তখন অপর পাশ থেকে জবাব আসে, “যারা আজ থেকে আরো ১২ বছর আগে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে, তাদের কীভাবে ফিরিয়ে দেবো?” তখন তিনি বলেন, “তাহলে হিসাবের দিন কীভাবে কোটি কোটি মৃতকে পুনরুজ্জীবিত করবে?” এভাবেই কিছুক্ষন কথোপকথনের পর আল্লাহ তাঁর বন্ধুর সঙ্গে একমত হন, গাউসুল আজম বুড়িকে সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে তার ছেলেকে আহ্বান করার নির্দেশ দিলেন। বুড়িও কথামতো তার ছেলেকে মমতাময়ী ভাষায় ডাকতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর তার ছেলে, পুত্রবধূ এবং বরযাত্রী অক্ষত অবস্থায় ,এমনকি যে পোশাকে অতল হয়েছিল  সেই পোশাকেই সাগর হতে উঠে আসে।
এই ঘটনা ব্যতীত তাঁর অসংখ্যবার মৃত মুরগীর অংশবিশেষকে “কুম বিইজনিহ্”, “বিসমিল্লাহ কুম” বলে জ্যান্ত মুরগীতে পরিণত করার ঘটনা রয়েছে। তাছাড়া তাঁর অন্যান্য কারামতের মাঝে পানির উপর হাঁটা, শয়তানের প্রলোভন প্রতিহত করণ ইত্যাদিও প্রচলিত।

ইন্তেকাল:
জীবনকালে নিজের সর্বস্ব দিয়ে জগতে দ্বীনি ইলম কায়েম করার পর বার্ধক্যজনিত স্বাভাবিক অসুস্থতার কারণে এই মহাপুরুষ ৫৬১ হিজরীতে ১১ই রবিউস সানি, বাগদাদ নগরীতে ইন্তেকাল করেন। সাকারাতকালেও যখন তাঁর থেকে, তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা জানতে চাওয়া হয়, তিনি বলেন, তাঁর হৃৎপিণ্ড ব্যতীত সারা অঙ্গ  ব্যথায় কাতর। কেননা, তাঁর অন্তর আল্লাহ্-র ধ্যানে নিমজ্জিত, গাউসুল আজম বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী আল হাসানী আল হোসাইনী (রহ.) এর ওফাত দিবসে (১১ই রবিউস সানী) মুসলিম বিশ্বে “ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহুম হিসেবে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালন করা হয়।

গাউসে পাক রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর
জীবনী হতে শিক্ষা:

ক) সৎ ও সত্যবাদিতা :
গাউসুল আজমের জীবন সততা ও সত্যবাদিতার এক অনন্য  আদর্শের প্রতিচ্ছবি। পূর্ব বর্ণিত বাগদাদ ভ্রমণের ঘটনা থেকে তাঁর সত্যবাদিতার সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেন: “যদি  সত্য কথা বলার অভ্যাস করতে পারো ,তাহলে আল্লাহ তোমাকে রুহনী দৃষ্টি শক্তি ও ইলম দান করবে।”

খ) আল্লাহভীতি:
আল্লাহভীতি আসল  প্রজ্ঞা। গাউসে পাক নিজের প্রত্যেক পদক্ষেপে আল্লাহভীতির পরিচয় দিতেন, তিনি বলেন: “তুমি আল্লাহকে যত বেশি ভালোবাসবে, মানুষ তত বেশি তোমাকে ভালোবাসবে, এবং তুমি যত বেশি আল্লাহকে ভয় করবে, মানুষ তত বেশি তোমাকে ভয় করবে (শ্রদ্ধা করবে)।”

গ) ধৈর্যশীলতা:
ধৈর্য হলো আল্লাহর নৈকট্য ও আধ্যাত্মিক উন্নতির মূল চাবিকাঠি। গাউসে পাক বলেন: “বিপদ-আপদ হলো মুমিনের জন্য পরীক্ষা, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে ও ধৈর্য ধরে, আল্লাহ তার ঈমানকে আরও মজবুত করেন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন।”

ঘ) অন্তরের পবিত্রতা:
বড়পীরে অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার, পার্থিব আকর্ষণ থেকে বিরত রাখার উপরে গুরুত্বারোপ করে বলেছেন: ‘রিয়া, হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা ও অহংকার হলো অন্তরের প্রধান ব্যাধি, এগুলো থেকে মুক্ত না হলে অন্তর কখনো আল্লাহর নূরে আলোকিত হতে পারে না’। তিনি আরও বলেন, “দৃঢ় বিশ্বাস এবং অন্তরের পবিত্রতা ততক্ষণ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, যতদিন না তোমার অন্তরে এই পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসার সামান্যতম কণা অবশিষ্ট থাকবে।”

ঙ) আমলবিহীন জ্ঞান:
আমলবিহীন জ্ঞান সম্পর্কে বড়পীরের রচিত বই “আল ফাতহুর রব্বানী”-এ বিশেষ আলোকপাত করা হয়েছে। তাঁর মতে, জ্ঞান তরবারি হলে আমল তার ধার। তিনি আমলবিহীন জ্ঞানকে ফলহীন বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেন।তিনি সতর্কতাস্বরুপ  বলেন, “তুমি যদি তোমার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী আমল না করো, তবে কিয়ামতের দিন সেই জ্ঞানই তোমার বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে দাঁড়াবে।”

চ) উদারতা:
গাউসুল আজম ছিলেন উদার ও বৃহৎ মনের অধিকারী, তিনি বলেন, “মানুষ আমি মানুষকে উদার মনে পরিচয় দেওয়ার চেয়ে উত্তম কোনো আমল খুঁজে পাইনি,” তিনি আরও বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি উদার ও দয়ালু হয়, সে আল্লাহর অনেক কাছাকাছি থাকবে।”

গাউসের পাকের স্বভাব -চরিত্র, মূল্যবোধ, জীবননীতি-সবই একটি আদর্শ জীবন পরিচালনা করার জন্য অনুকরণীয়। যারা তার জীবনী হতে  শিক্ষা গ্রহণ করে, তা নিজ জীবনের মূলনীতি তে বাস্তবায়ন করেছে ,তারা সকলেই নিজেকে সফলতার উচ্চ মাকামে আবিষ্কার করেছে।

প্রতীয়মান যে, গাউসুল পাক ছিলেন এমন এক মহামানব, যাঁর আদর্শ আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে জীবনের উন্নতি সাধন করা সম্ভব। তিনি ছিলেন সততা ও সত্যবাদিতার দিক দিয়ে অটল। অপর দিকে দীনি ইলম ও পার্থিব জ্ঞানেও অনুপম। যুগের পর যুগ খুঁজলেও তাঁর প্রতিদ্বন্দী মেলা অকল্পনীয়।এই মহান আউলিয়ার রেখে যাওয়া নিদর্শনের ওপর অনুগমন করে  সর্বযুগের আলেমগণ নিজেদের সফলতা নিশ্চিত করেছে এবং করছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনকে আউলিয়ায়ে কেরামের নেগাহ করম ও  অসীম ফয়ুজাত দিয়ে আলোকিত করে দিন। আমিন বেহুরমতে সায়িদিল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

লেখিকা শিক্ষার্থী,
জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা কামিল মাদরাসা, ষোলশহর, চট্টগ্রাম।

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
কপিরাইট © ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট