
একজন তরুণ যখন জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রাখে, তখন তার হৃদয়ে থাকে অসংখ্য স্বপ্ন। নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নতুন শিক্ষক, নতুন বন্ধু আর নতুন পরিবেশ তাকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়। বিশেষ করে কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ একজন শিক্ষার্থীর জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই সময়টুকু তার মনে আনন্দ, আত্মবিশ্বাস ও সম্ভাবনার আলো জ্বালানোর কথা। অথচ সেই আলোকিত পথের শুরুতেই যদি তাকে ভয়, অপমান, হুমকি কিংবা মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে তার স্বপ্নের শিক্ষাঙ্গনই হয়ে উঠতে পারে আতঙ্কের জায়গা। র্যাগিংয়ের নামে এমন বাস্তবতা আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগের।
র্যাগিংকে অনেক সময় ‘মজা’, ‘পরিচিতি পর্ব’ কিংবা ‘সিনিয়রদের ঐতিহ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু যে আচরণ একজন শিক্ষার্থীকে অপমানিত, আতঙ্কিত বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে, সেটিকে নিছক মজা বলার সুযোগ নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধ সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৩’-এ বুলিং ও র্যাগিংয়ের বিভিন্ন ধরন চিহ্নিত করা হয়েছে। মৌখিক অপমান, গালিগালাজ, হুমকি, উপহাস, শারীরিক আঘাত, অস্বস্তিকর কোনো কাজ করতে বাধ্য করা, ব্যক্তিগত সম্পদের ক্ষতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তা এবং যৌন হয়রানিমূলক আচরণও পরিস্থিতি অনুযায়ী এর আওতায় পড়তে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। সুস্থ পরিচিতি আর র্যাগিং এক নয়। একজন সিনিয়র শিক্ষার্থী নবীনকে ক্যাম্পাসের নিয়মকানুন জানাতে পারেন, বিভাগ ও শিক্ষকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে পারেন। এতে বন্ধুত্ব তৈরি হয়, পারস্পরিক আস্থা গড়ে ওঠে। কিন্তু কোনো নবীন শিক্ষার্থীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অপমানজনক বা অস্বস্তিকর কোনো কাজ করতে বাধ্য করা হলে সেটি আর বন্ধুত্বপূর্ণ পরিচিতি থাকে না। সেখানে শুরু হয় ক্ষমতার অপব্যবহার।
বাংলাদেশে বিষয়টি প্রতিরোধে নীতিগত কাঠামো রয়েছে। ২০২৩ সালের নীতিমালায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধ কমিটি গঠন, অভিযোগ গ্রহণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর যথাযথ তদন্ত এবং অপরাধের ধরন অনুযায়ী প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনও বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে র্যাগিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা ও নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।
কিন্তু শুধু নীতিমালা কিংবা শাস্তির বিধান থাকলেই র্যাগিং বন্ধ হবে না। প্রয়োজন শিক্ষাঙ্গনের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন। ‘আমাদের সময়ও র্যাগিং হয়েছে, তাই তোমাদেরও সহ্য করতে হবে’ এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অতীতে কোনো অন্যায় হয়েছে বলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও সেই অন্যায় বহন করতে হবে, এমন কোনো যুক্তি নেই। বরং যারা অতীতে কষ্ট পেয়েছে, তাদেরই উচিত পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা।
এখানে শিক্ষক, প্রশাসন ও অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিক্ষার্থী র্যাগিংয়ের শিকার হলে তাকে দোষারোপ না করে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। অভিযোগ জানানোর পর যেন সে আরও হয়রানি বা সামাজিক চাপের শিকার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠলেই যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করতে হবে।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু ভালো ফলাফল, বড় ভবন কিংবা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে মাপা যায় না। সেখানে একজন শিক্ষার্থী কতটা নিরাপদ, সম্মানিত এবং স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চা করতে পারছে, সেটিও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মানের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। যে ক্যাম্পাসে একজন নবীন প্রথম দিনেই আতঙ্কিত হয়, সেখানে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার প্রয়োজন আছে।
র্যাগিং কোনো ঐতিহ্য নয়, কোনো শিক্ষাপদ্ধতি নয়, সুস্থ বিনোদনও নয়। শিক্ষাঙ্গনে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক হবে সহযোগিতা ও সম্মানের। নবীনকে ভয় দেখিয়ে নয়, হাত বাড়িয়ে এগিয়ে নিতে হবে। কারণ একজন সিনিয়র শিক্ষার্থীর প্রকৃত বড়ত্ব তার ক্ষমতা প্রদর্শনে নয়, একজন নবীনের পাশে দাঁড়ানোর মানবিকতায়।
র্যাগিংকে তাই কোনোভাবেই নিছক মজা, পরিচিতি পর্ব কিংবা শিক্ষাঙ্গনের প্রচলিত সংস্কৃতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একদল মানুষ যখন একজন নবীন শিক্ষার্থীকে ঘিরে সম্মিলিতভাবে ভয় দেখায়, অপমান করে কিংবা তার ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করে, তখন সেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদার ওপর সমষ্টিগত শক্তির প্রয়োগ ঘটে। এই অর্থে র্যাগিংকে এক ধরনের মব কালচার হিসেবেও দেখা যায়, যেখানে দলবদ্ধতার আড়ালে ব্যক্তির ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতা তৈরি হয়। শিক্ষাঙ্গনে এমন সংস্কৃতির কোনো স্থান হতে পারে না।
স্বপ্ন পূরণের জন্য যে শিক্ষার্থী শিক্ষাঙ্গনে আসে, তাকে যদি প্রথমেই আতঙ্কের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে শিক্ষা ও মানবিকতার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই র্যাগিং বন্ধে শুধু আইন, নীতিমালা বা শাস্তির বিধান যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক হোক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার। নতুন শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে এসে যেন অনুভব করে, এই প্রতিষ্ঠান তার নিজের, এখানে তার কথা শোনা হবে, তার মর্যাদা রক্ষা করা হবে এবং তার স্বপ্নকে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করা হবে। স্বপ্নের শিক্ষাঙ্গনে স্বাগত হোক মানবিকতায়, আতঙ্কে নয়।
লেখক পরিচিতি: কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক।
Leave a Reply