1. news@dainikchattogramerkhabor.com : Admin Admin : Admin Admin
  2. info@dainikchattogramerkhabor.com : admin :
শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
বাংলাদেশের নবনির্বাচিত ২৩তম মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: জাতির প্রত্যাশা -মহিউদ্দীন কাদের নিষিদ্ধ সংগঠন দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের উদ্যোগে ২১ আগষ্টের বীর শহীদের স্মরণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত ভোক্তা অধিকারের অভিযান পটিয়ায় মেয়াদোত্তীর্ণ ডায়াপার নতুন তারিখ বসিয়ে বাজারজাত, জরিমানা ২ লাখ ৫০ হাজার আদর্শ ছাত্র ও যুব সমাজের অর্ধযুগ পূর্তি উপলক্ষে বৃদ্ধাশ্রম ও এতিমখানায় খাবার বিতরণ, বৃক্ষরোপণ এবং সর্বোচ্চ রক্তদাতাকে সম্মাননা। পটিয়ার কচুয়াই সড়ক সংস্কারে এলাকাবাসীর স্বস্তি ফিরেছে জীবনযুদ্ধে থেমে নেই পটিয়ার আবদুস শুক্কুর শুক্রবার এলেই ফ্রি খাবার ও নগদ অর্থ নিয়ে অসহায়দের পাশে পটিয়ার নুরুল আলম পানি ন্যায়বিচারের দাবিতে যুবদের আন্দোলনে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পোর্টাল সাংবাদিকদের সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠন NPJA-এর বাংলাদেশ কমিটি ঘোষণা চট্টগ্রামে ১১০০ আওয়ামীলীগ নেতাকর্মী জামিনে মুক্ত

বাংলাদেশের নবনির্বাচিত ২৩তম মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: জাতির প্রত্যাশা -মহিউদ্দীন কাদের

  • সময় শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২১ পঠিত

 

একাধারে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব এবং শক্ত হাতে দলীয় সংকট মোকাবিলা করে দেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ব্যাক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজপথ থেকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তার মনোনয়ন রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল এক মাইলফলক। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিকূল রাজনৈতিক স্রোতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) হাল ধরে রাখা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবার অধিষ্ঠিত হয়েছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে। দেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১৩ আগস্ট দলের প্রার্থী হিসেবে তার মনোনয়নপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা হয়েছে। বেলা আড়াইটার দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে বিএনপির শীর্ষ নেতারা এই মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর আগে, বঙ্গভবনের এই সর্বোচ্চ পদের জন্য মনোনীত হওয়ার পরপরই মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিব এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তার নাম প্রস্তাব করলে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করেন। নির্বাচনে তার পক্ষে প্রস্তাবক হয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এবং সমর্থক হয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

গত ২৪ জুলাই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করায় এই পদটি শূন্য হয়, যার পর থেকে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া একদম সহজ ছিলো। তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের পক্ষে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদও মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০ আগস্ট ব্যালটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়।

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, গত ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিলো। এরপর দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন গতকাল দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। ভোটগ্রহণ শেষে চলে গণনা। ভোট গণনায় দেখা যায়, ৩৪৯ ভোটের মধ্যে ভোট পড়েছে ৩৪৩টি। এরমধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট আর অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

জাতীয় সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এবং সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ১৯তম ব্যক্তি এবং মেয়াদ ও সময়ক্রমের বিচারে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। মাঠের রাজনীতির একজন ক্লান্তিহীন সেনাপতি থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তার এই উত্তরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করছে।

পারিবারিক ঐতিহ্য ও রাজনীতির প্রাক-কথন:

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ের এক সম্ভ্রান্ত এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ প্রভাবশালী পরিবারে জন্ম নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার পারিবারিক ঐতিহ্যও রাজনৈতিকভাবে বেশ সমৃদ্ধ এবং ধমনীতে রাজনীতির রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রেই। তার পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন দেশভাগের আগে ও পরে ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত আইনজীবী এবং একাধিকবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, যিনি স্বাধীন বাংলাদেশে বিএনপির রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।

কেবল পিতাই নন, মির্জা ফখরুলের পারিবারিক পরিমণ্ডল ছিল দেশের ইতিহাসের নানা বাঁকের সাথে যুক্ত। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা এবং দেশের একজন প্রখ্যাত আইনবিদ। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ভূমিমন্ত্রী, দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে স্পিকার এবং পরবর্তীতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অপর চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকারের ‘ডাইরেক্টোরেট অব ইয়ুথ ক্যাম্প’-এর পরিচালক হিসেবে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

শিক্ষা, ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষকতার সোনালী দিনগুলো:

পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রেখে মির্জা ফখরুল পড়াশোনায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তার ভেতরে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। ষাটের দশকের সেই উত্তাল সময়ে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) সক্রিয় সদস্য হিসেবে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। মেধা ও নেতৃত্বের কারণে তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন।

তবে ছাত্র রাজনীতি শেষে তিনি সরাসরি মূলধারার রাজনীতিতে না গিয়ে বেছে নেন আলো ছড়ানোর পেশা শিক্ষতার জীবন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি নিজের স্মৃতিবিজড়িত ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সরকারি পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে নিরীক্ষক হিসেবেও দক্ষতার সাথে কাজ করেন।

১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মির্জা ফখরুল তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা দখল করলে এবং উপপ্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে, মির্জা ফখরুল ইসলাম পুনরায় তার প্রিয় শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান এবং ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তরুণদের আলো ছড়াতে থাকেন।

মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ:

শৈশব ও কৈশোরের রাজনৈতিক চেতনা মির্জা ফখরুলকে বেশিদিন চার দেয়ালের শ্রেণিকক্ষে আটকে রাখতে পারেনি। ১৯৮৬ সালে তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে চিরদিনের মতো ইস্তফা দিয়ে সরাসরি নামেন জনমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। ১৯৮৮ সালের পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং তৃণমূলের মানুষের মন জয় করেন। পরবর্তীতে এরশাদের সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন তিনি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নেতা ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন এবং একই সাথে জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

সংসদীয় রাজনীতি ও মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতা:

সংসদীয় রাজনীতির শুরুর পথটা মির্জা ফখরুলের জন্য মসৃণ ছিল না। ১৯৯১ সালের পঞ্চম এবং ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। তবে দমে না গিয়ে তিনি মাঠের সংযোগ ধরে রাখেন। যার সুফল মেলে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীকে পরাজিত করে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১০ ভোট পেয়ে তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় তার প্রশাসনিক দক্ষতা মূল্যায়িত হয়। তিনি প্রথমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়াতে তিনি পরাজিত হলেও, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই সাথে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে দলীয় মনোনয়ন পান এবং বগুড়া-৬ আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। তবে দলীয় কৌশলগত সিদ্ধান্তের কারণে তিনি সে সময় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

সংকটে দলের কাণ্ডারি: মহাসচিব পদে আরোহন

২০০৮ সালের পর বিএনপির রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় শুরু হয়। আর ঠিক এই সময়েই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে দলের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে তিনি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। একই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি দলের ও বিরোধী জোটের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমে অত্যন্ত মার্জিত, যুক্তিপূর্ণ ও জোরালো বক্তব্য দিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমাদর পান। ২০১১ সালের ২০ মার্চ তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের আকস্মিক মৃত্যুর পর এক রাজনৈতিক শূন্যতার তৈরি হয়। দলীয় প্রধান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তখন মির্জা ফখরুল ইসলামকে দলের ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ হিসেবে ঘোষণা করেন। শুরুতে এই পদায়ন নিয়ে দলে কিছুটা আলোচনা-বিভ্রান্তি তৈরি হলেও, ২০১১ সালের ২১ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া বিদেশ সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে পুনরায় তার ওপর আস্থা পুনর্ব্যক্ত করলে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটে। দীর্ঘ পাঁচ বছর দক্ষতার সাথে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পর, ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।

বিএনপির কঠিন সময়ে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের অন্যতম প্রধান টার্গেট ছিলেন তিনি। এমন বাস্তবতায় সহ্য করেছেন হামলা-মামলা-কারাবরণ। গত চার দশক রাজপথের আন্দোলন আর দলের সাংগঠনিক রাজনীতিতে অনবদ্য ভূমিকা রেখে এই মুহুর্তে দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা জাতিকে পথ দেখিয়েছে গভীর সংকটময় মুহুর্তে।

মামলা, কারাজীবন ও সহনশীলতার জীবন্ত প্রতীক:

২০১৩ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান সমন্বয়ক ও সাংগঠনিক নির্দেশকের ভূমিকা পালন করেন। বিগত দেড়-দুই দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হয়ে উঠেছেন এক ক্লান্তিহীন লড়াকু এবং চরম সহনশীলতার প্রতীক। বিরোধী দলের শীর্ষ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি ক্রমাগত রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছেন। তার রাজনৈতিক জীবনের এক বিশাল অংশ কেটেছে আদালতের বারান্দায় অথবা কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে। গাড়ি ভাঙচুর, পুলিশের কাজে বাধা, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড কিংবা বোমাবাজির মতো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ১০০টিরও বেশি মামলা দেওয়া হয়েছে তার নামে। রাজপথের লড়াই পরিচালনা করতে গিয়ে তাকে অন্তত ১১ বার কারাগারে যেতে হয়েছে এবং জীবনের মূল্যবান প্রায় সাড়ে তিন বছর সময় কাটাতে হয়েছে কারান্তরালে। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের আন্দোলনের সময় যেমন তাকে মাসের পর মাস বন্দি রাখা হয়েছে, তেমনি ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার ঠিক পরদিনই একটি পুরোনো মামলায় তাকে জেলে যেতে হয়েছিল।

এমনকি ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নয়াপল্টনের সমাবেশের আগে গভীর রাতে উত্তরার বাসভবন থেকে ডিবি পুলিশ কর্তৃক তাকে তুলে নেওয়া কিংবা ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের সমাবেশের পরদিন ভোরে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস কারাগারে থাকার ঘটনাগুলো তার ওপর নেমে আসা ধারাবাহিক নিগ্রহেরই প্রমাণ। বয়স ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা, হৃদ্‌রোগের জটিলতা এবং নানা শারীরিক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও তাকে দিনের পর দিন স্যাঁতসেঁতে কারাগারে কাটাতে হয়েছে। রাজপথে বহুবার টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং তার গাড়িবহরে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সকল নির্যাতন, উসকানি আর কারাবাসের পরও রাজনীতি থেকে পিছিয়ে না গিয়ে ধীরস্থির, মার্জিত ও অহিংস নীতি অবলম্বন করে তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন:

রাজনৈতিক ঝড়-ঝাপটার মাঝে মির্জা ফখরুলের ব্যক্তিগত জীবন শান্ত ও ছিমছাম। তিনি রাহাত আরা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। এই দম্পতির দুই কন্যা সন্তান রয়েছেন। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই শিক্ষকতা করেছেন এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ-ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং বর্তমানে ঢাকার একটি নামি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন।

শ্রেণিকক্ষের অর্থনীতি পড়ানোর অধ্যাপক থেকে রাজপথের তপ্ত রোদে স্লোগান দেওয়া, কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে কোটি মানুষের দলের নেতৃত্ব দেওয়া—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবন যেন এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। দলীয় রাজনীতি এবং মহাসচিবের পদ ছেড়ে তিনি পদার্পণ করতে যাচ্ছেন বঙ্গভবনে, দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে। বিএনপি একজন যোগ্য মানুষকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নিয়েছে। কারণ বিগত ফ্যাসিবাদবিরোধী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে তার অসামান্য অবদান ছিল। জাতির প্রত্যাশা—এই সুযোগ তিনি দায়িত্বশীলতা, প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও সাংবিধানিক মর্যাদার সঙ্গে কাজে লাগাবেন।

আশা করি, তিনি দক্ষতার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করবেন। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে একজন সর্বজনগ্রাহ্য, অভিজ্ঞ এবং সহনশীল অভিভাবক হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ জনগণের। দেশের নবনির্বাচিত ২৩তম মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

লেখকঃ কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক
মহাসচিব, শহীদ জিয়া রিসার্চ সেন্টার

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
কপিরাইট © ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট