
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিয়ের নাম করে ১৫ মাসের ‘বেডরুম প্রতারণা’শেষে উধাও গার্মেন্টস কর্মকর্তা।
চট্টগ্রাম মহানগরীর ইপিজেড এলাকায় বিয়ের আশ্বাস দিয়ে এক নারীকে দীর্ঘ ১৫ মাস ধরে স্বামী স্ত্রীর মতো সংসার করিয়ে পরবর্তীতে বিয়ে না করে ফেলে রেখে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইয়ং ওয়ান গার্মেন্টসের ফ্লোর ইনচার্জ শাখাওয়াতের বিরুদ্ধে।ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুরো ইপিজেড এলাকা জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।ভুক্তভোগী নারী কুলছুমা বেগম অভিযোগ করেছেন প্রেম ভালোবাসা বিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার স্বপ্ন দেখিয়ে তাকে পরিকল্পিতভাবে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে দীর্ঘ সময় সহবাস ও সংসার করেছেন শাখাওয়াত।শুধু মানসিক ও সামাজিক ক্ষতিই নয় সংসার চলাকালীন নানা অজুহাতে তার কাছ থেকে প্রায় ৫ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সাখাওয়াত সবশেষে সন্তান না হওয়ার অভিযোগ তুলে হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাকে একা ফেলে রেখে চলে যান । কুলছুমা বেগম আমাদের প্রতিবেদককে জানান চট্টগ্রাম ইপিজেডে একই কারখানায় চাকরি করার সুবাদে শাখাওয়াতের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।ধীরে ধীরে সেই পরিচয় প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়।দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পর শাখাওয়াত তাকে বিয়ের আশ্বাস দেন এবং বলেন খুব শিগগিরই সামাজিকভাবে বিয়ে করবেন।
এই আশ্বাসের ওপর ভর করেই কুলছুমা ইপিজেড এলাকার আহাম্মদিয়া স্কুল সংলগ্ন জয়নাল সাহেবের ভাড়া বাসায় শাখাওয়াতের সঙ্গে একত্রে বসবাস শুরু করেন।তিনি বলেন আমি তাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম আমার জীবন ভবিষ্যৎ সবকিছু তার ওপর নির্ভর করে দিয়েছিলাম।সংসার চলাকালীন বিভিন্ন সময় সে আমার কাছ থেকে টাকা নেয় কখনো বলে গ্রামের বাড়িতে সমস্যা কখনো বলে জরুরি প্রয়োজন আবার কখনো বলে বিয়ের প্রস্তুতি চলছে এইভাবে মোট পাঁচ লাখ ষাট হাজার টাকা আমি তাকে দিয়েছি।
কুলছুমা আরো বলেন,সহবাসের আগ মুহূর্তে বা সংসারের বিভিন্ন সময় সে আমাকে বারবার বিয়ের তারিখ দিত কিন্তু সেই তারিখ কখনো বাস্তবায়ন হয়নি।একপর্যায়ে হঠাৎ করে সে আমার বিরুদ্ধে বন্ধ্যাত্বের অভিযোগ তোলে এবং আমাকে মানসিকভাবে চাপ দিতে শুরু করে।এরপর গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে কোনো পূর্ব বার্তা ছাড়াই সে বাসা ছেড়ে চলে যায় এবং আমার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।আমি তখন বুঝতে পারি আমাকে পরিকল্পিতভাবে ফেলে রেখে সে চলে গেছে। সম্পর্কের শুরুতে সে যে বিবাহিত তা গোপন রেখেছিল সাখাওয়াত। সম্প্রতি আমাকে রেখে চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন মারফতে আমি জানতে পারি তার বাড়িতে স্ত্রী রয়েছে। এছাড়াও সে আমি চাকরিতে থাকা অবস্থায় বাসায় অন্য নারী এনে সময় পার করে।
এই ঘটনার পর কুলছুমা চরম নিরাপত্তাহীনতা মানসিক বিপর্যয় এবং সামাজিক হেনস্তার মুখে পড়েন।স্থানীয়দের ভাষ্যমতে দীর্ঘদিন ধরে কুলছুমাকে শাখাওয়াতের স্ত্রী হিসেবেই এলাকায় পরিচয় দেওয়া হতো। ফলে শাখাওয়াত চলে যাওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হলে কুলছুমাকে নানা প্রশ্ন অপমান ও কটূক্তির মুখে পড়তে হয়।অনেক আত্মীয় স্বজন ও পরিচিতজন তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীর ছোট বোন আমাদের প্রতিবেদককে বলেন পারিবারিকভাবে আমরা শুরু থেকেই এই সম্পর্ক মেনে নেইনি কিন্তু যখন জানতে পারি তারা একসঙ্গে বসবাস করছে তখন আমি ও আমার ভাই শাখাওয়াতকে আইনিভাবে বিয়ের “কাবিন” করে বিয়ে করার জন্য একাধিকবার বলি।
সে বারবার কিছুদিন সময় চেয়ে আমাদের আশ্বস্ত করত কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আমার বোনকে ফেলে রেখে চলে গেছে। তিনি আরো জানান, গত ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যা আনুমানিক আটটার দিকে আমরা ইপিজেড থানায় যাই এবং ডিউটি অফিসার এস আই আরিফ সাহেবকে ঘটনার বিস্তারিত জানাই। তিনি একটি কাগজে সব তথ্য লিখে নেন এবং শাখাওয়াতকে থানায় ডেকে কথা বলার আশ্বাস দেন।তবে এতদিন পেরিয়ে গেলেও আমরা এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর আইনি সহায়তা পাইনি।
প্রতিবেশী মনোয়ারা বেগম প্রতিবেদককে বলেন, সাখাওয়াত ও কুলসুমা দীর্ঘ সময় ধরে আমার পাশের রুমেই ভাড়া থেকে ছিল।আমি তাদের আইনিভাবে বিয়ে করার পরামর্শ বহুবার দিলেও তারা তা করেননি।
এ বিষয়ে প্রতিবেদক এস আই আরিফের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান জি এ বিষয়ে আমি অভিযুক্ত সাখাওয়াতের সাথে যোগাযোগ করে থানায় আসতে বললে সে থানায় আসতে অস্বীকৃতি জানাই।
উল্লেখ্য যে, ভুক্তভোগী পরিবার জানাই ইতিমধ্যেই তারা মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করেছেন।
এদিকে আইন সংশ্লিষ্টরা বলছেন লিখিত বা রেজিস্ট্রিকৃত বিয়ে না থাকলেও বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দীর্ঘদিন একত্রে বসবাস এবং পরে প্রতারণার মাধ্যমে সম্পর্ক ছিন্ন করা দণ্ডবিধির প্রতারণা ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
একই সঙ্গে এটি নারীর প্রতি নির্যাতন ও সামাজিক ক্ষতির বিষয় হিসেবেও বিবেচিত হয়।এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট রেখা চৌধুরী বলেন বিয়ে ছাড়া দীর্ঘ সময় এক চালের নিচে থাকা আইনগতভাবে অন্যায় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি পরকীয়ায় লিপ্ত থেকেছেন যা দণ্ডনীয় অপরাধ।
অভিযুক্ত শাখাওয়াতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমাদের প্রতিবেদককে বলেন কুলছুমার সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের পরিচয়ে প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তিনি বিয়ে করবেন তবে কিছু সময় দরকার। তিনি আরও দাবি করেন কুলছুমার কখনো সন্তান হবে না আমি অনেক চেষ্টা করেছি।তাই তিনি বিয়ে করতে দেরি করছেন এবং তাকে বিভিন্ন ডাক্তারও দেখিয়েছেন।
সূত্রে জানা গেছে শাখাওয়াতের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় এবং সেখানে স্ত্রী তার রয়েছে। এতে করে তার উদ্দেশ্য নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।সচেতন মহল ও নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন কর্মক্ষেত্রকে ব্যবহার করে নারীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে অর্থ ও শারীরিক সুবিধা নেওয়ার এমন ঘটনা ভয়াবহ অপরাধ। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
Leave a Reply