
মুসলিম বিবাহ ব্যবস্থায় দেনমোহর বা মাহর কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা কিংবা বিবাহের দেনা-পাওনার বিষয় নয়; এটি নারীর সম্মান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, দেনমোহর স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সম্মান, দায়বদ্ধতা ও অঙ্গীকারের প্রতীক। এই অর্থ বা সম্পদ সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি, যার ওপর অন্য কারও কোনো মালিকানা বা হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ৪ নম্বর আয়াতে নারীদের মোহরানা সন্তুষ্টচিত্তে পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলামী আইনেও দেনমোহরকে দান বা অনুগ্রহ নয়, বরং বিবাহচুক্তির একটি বাধ্যতামূলক শর্ত এবং স্বামীর ওপর আরোপিত আইনগত ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্ত্রী দেনমোহরের বৈধ দাবিদার হন। এমনকি কাবিননামায় দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ না থাকলেও ইসলামী আইন অনুযায়ী স্ত্রী মোহর-ই-মিসল পাওয়ার অধিকারী, অর্থাৎ তার সামাজিক অবস্থান ও পারিবারিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেনমোহর নির্ধারণ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে দেনমোহর-সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত হয়েছে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961)-এর ১০ ধারা অনুযায়ী, কাবিননামায় দেনমোহর তাৎক্ষণিক (Prompt) নাকি বিলম্বিত (Deferred) হবে তা উল্লেখ না থাকলে পুরো দেনমোহরই তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধযোগ্য বলে গণ্য হবে। অন্যদিকে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী কাবিননামায় দেনমোহরের পরিমাণ ও পরিশোধের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। এছাড়া পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ (Family Courts Act, 2023) অনুযায়ী স্ত্রী দেনমোহর আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। আদালত মামলার প্রকৃতি, প্রমাণ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেনমোহর পরিশোধের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান করতে পারেন। এই আইনের মাধ্যমে পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে আরও যুগোপযোগী ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইনের এত সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা যায়, দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম নারী তাঁদের প্রাপ্য দেনমোহর কখনোই আদায় করতে পারেন না। অনেকেই ভুলভাবে মনে করেন, কেবল তালাকের পরই দেনমোহর দাবি করা যায়। বাস্তবে বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর থেকেই এটি স্ত্রীর আইনগত অধিকার। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের সময় দেওয়া গয়না, পোশাক বা অন্যান্য উপহারকেই দেনমোহর হিসেবে প্রচার করা হয়। অথচ কাবিননামায় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলে এসব উপহার দেনমোহরের বিকল্প হিসেবে গণ্য হয় না।
বর্তমানে দেনমোহর নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুটি বিপরীতধর্মী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। একদিকে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় অনেক পরিবার স্বামীর আর্থিক সক্ষমতার বাইরে অত্যন্ত উচ্চ অঙ্কের দেনমোহর নির্ধারণ করে, যা পরবর্তীতে পারিবারিক বিরোধ ও আইনি জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে অনেক নারীকে পারিবারিক বা সামাজিক চাপে দেনমোহর মওকুফ করতে বাধ্য করা হয়। ইসলামী আইন ও প্রচলিত আইনের দৃষ্টিতে এমন মওকুফ তখনই বৈধ, যখন তা স্ত্রীর সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বেচ্ছায় গৃহীত সিদ্ধান্ত হয়; কোনো প্রকার চাপ, ভয়ভীতি বা প্রভাবের মাধ্যমে আদায় করা মওকুফ আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
দেনমোহর কেবল বিবাহিত জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; স্বামীর মৃত্যুর পরও এর আইনগত গুরুত্ব বহাল থাকে। দেনমোহরকে স্বামীর সম্পত্তির ওপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে উত্তরাধিকার বণ্টনের আগে দেনমোহর পরিশোধ করতে হয়। প্রয়োজন হলে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি নিজের দখলে রেখে দেনমোহর আদায়ের দাবি জানাতে পারেন, যা আইনশাস্ত্রে Widow’s Right of Retention নামে পরিচিত এবং মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে স্বীকৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি।
এ প্রসঙ্গে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। এই আইনে যৌতুক গ্রহণ বা প্রদান দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অথচ সমাজের একটি অংশ এখনো দেনমোহর ও যৌতুককে এক করে দেখে, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। যৌতুক হলো কনের পরিবার থেকে বরের পরিবারকে অবৈধ সুবিধা প্রদান, আর দেনমোহর হলো স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর জন্য আইনস্বীকৃত ও ধর্মসম্মত একটি বাধ্যতামূলক অধিকার। এ দুটি বিষয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেনমোহরকে তার প্রকৃত উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব, যা নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেনমোহরের প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রতিযোগিতা বা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন নয়; বরং নারীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই দেনমোহর নির্ধারণে আবেগ বা সামাজিক চাপের পরিবর্তে উভয় পক্ষের বাস্তব সামর্থ্য, ন্যায়সংগত বিবেচনা এবং আইনগত সচেতনতার প্রতিফলন থাকা জরুরি। একই সঙ্গে দেনমোহর সময়মতো পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে নারীর অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক স্থিতিশীলতাও আরও সুদৃঢ় হবে।
লেখক – ৫৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ,আইন বিভাগ, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি
Leave a Reply