
বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি, প্রাচ্যের রানী, বাংলাদেশের প্রধান বন্দরনগরী ও বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে যখন নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন প্রশ্ন জাগে—কেন এমন হচ্ছে, এর জন্য দায়ী কে এবং এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
আমাদের শৈশবে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে একটানা কয়েক দিন বৃষ্টি হওয়া ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। প্রবল বর্ষণও দেখেছি, কিন্তু বর্তমান সময়ের মতো পুরো নগরীকে এভাবে অচল হয়ে যেতে খুব কমই দেখা গেছে। আগে জলাবদ্ধতা থাকলেও তা এতটা ভয়াবহ ছিল না। এখন শুধু বৃষ্টির পানিই নয়, জোয়ারের পানিতেও ডুবে যাচ্ছে চাক্তাই, খাতুনগঞ্জসহ নগরীর বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, দ্বিতীয় মেয়র মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, তৃতীয় মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, চতুর্থ মেয়র মনজুর আলম, পঞ্চম মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, ষষ্ঠ মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী, সপ্তম প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন এবং বর্তমানে অষ্টম মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের দায়িত্বকাল চলছে।
এর আগে বিভিন্ন মেয়রের আমলেও জলাবদ্ধতা ছিল, তবে বর্তমানে এর ব্যাপকতা অনেক বেড়েছে। মহিউদ্দিন চৌধুরী, মনজুর আলম, আ জ ম নাছির উদ্দীন, রেজাউল করিম চৌধুরী এবং ডা. শাহাদাত হোসেনের সময়েও চট্টগ্রামের মানুষ পানির সমস্যায় ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো মেয়রকেই এককভাবে এ সমস্যার জন্য দায়ী করি না।
আমার বিশ্বাস, এই সংকটের পেছনে রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবর্তন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাশয় ভরাট এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ। দিন দিন চট্টগ্রাম শহরে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, দ্রুতগতিতে গড়ে উঠছে নতুন নতুন আবাসন, ভবন, শিল্প-কারখানা ও স্থাপনা। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না অবকাঠামো ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।
প্রকৃতি বারবার আমাদের সতর্ক করছে। এই সতর্কবার্তাকে যদি আমরা গুরুত্ব না দিই, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নগরীর খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
এর পাশাপাশি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একসময় পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচারণা টেলিভিশন ও পত্রিকায় নিয়মিত দেখা যেত। বিশেষ করে—‘ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’—এই বার্তাটি মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের প্রচারণা আর তেমনভাবে চোখে পড়ে না। কেন এই প্রচারণা কমে গেছে, তা আমার জানা নেই। তবে বর্তমান বাস্তবতায় পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে নতুন করে জোরালো প্রচার-প্রচারণা চালানো সময়ের দাবি বলে আমি মনে করি।
চট্টগ্রাম শুধু একটি শহরের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এই নগরীকে রক্ষা করা মানে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। তাই সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশবিদ, পানি ও ভূবিজ্ঞানী, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সাধারণ জনগণ—সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
একই সঙ্গে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে, যেন তিনি আমাদের প্রিয় চট্টগ্রামকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করেন এবং এই সংকট মোকাবিলার জন্য আমাদের সঠিক পথ দেখান।
লেখক:
সমাজকর্মী, বন্দর, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।
Leave a Reply