
আলমগীর আলম।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জনপদ পটিয়া যুগে যুগে বহু গুণী মানুষের জন্ম দিয়েছে। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজসেবার নানা ক্ষেত্রে এ জনপদের কৃতী সন্তানরা দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় সংগীত, সংস্কৃতি ও মানবিক কর্মকাণ্ডের এক উজ্জ্বল নাম শহীদ ফারুকী। তিনি শুধু একজন বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত সংগীতশিল্পী নন, বরং একজন সংস্কৃতিসেবী, সংগঠক, অভিনেতা, প্রযোজক এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজকর্মী হিসেবেও সুপরিচিত।
শেকড়ের টানে বেড়ে ওঠা
১৯৭৫ সালের ১৫ জুন চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ফারুকী পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শহীদ ফারুকী। সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যচর্চায় সমৃদ্ধ একটি পরিবারে বেড়ে ওঠার ফলে শৈশব থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তার গভীর অনুরাগ তৈরি হয়।
তার পিতা মরহুম মিয়া আবু মোহাম্মদ ফারুকী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, লেখক, গবেষক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর। অন্যদিকে তার মা রোকেয়া বেগম ছিলেন একজন আদর্শ ও রত্নগর্ভা নারী। পারিবারিক এই মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশই তাকে একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষাজীবনে তিনি পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, পটিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং পরবর্তীতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সংগীত ছিল তার আত্মার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
সংগীতের পথচলা ও সাফল্যের গল্প
খুব অল্প বয়সেই সংগীতের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শিশুশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ বেতারে গান পরিবেশনের মাধ্যমে তার সংগীতজীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। মিষ্টি কণ্ঠ, সুরের প্রতি নিষ্ঠা এবং অসাধারণ পরিবেশনশৈলীর কারণে অল্প সময়েই তিনি শ্রোতামহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
চট্টগ্রামের খ্যাতনামা অডিও প্রতিষ্ঠান আমিন স্টোর থেকে তার প্রথম মিউজিক ভিডিও অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। অ্যালবামটিতে ছিল ১০টি গান, যার সুর ও কথা রচনা করেন এম.এন. আলম, উত্তম কুমার আচার্য এবং এস.এম. ফরিদুল হক।
একক সংগীতের পাশাপাশি বহু জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গে দ্বৈত সংগীত পরিবেশন করে তিনি সংগীতাঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। তার গান বাংলাদেশ টেলিভিশন, এটিএন বাংলা, মোহনা টিভি, বৈশাখী টিভি, আরটিভি, বাংলা টিভিসহ বিভিন্ন জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগীত ও সংস্কৃতি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে।
বহুমাত্রিক প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর
শহীদ ফারুকী শুধুমাত্র একজন সংগীতশিল্পী নন। তিনি একজন সফল অনুষ্ঠান পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রগ্রাহক এবং অভিনেতা হিসেবেও পরিচিত।
প্রখ্যাত পরিচালক নুরুল ইসলাম নুরুর টেলিফিল্ম “মন চোরা মাঝি”-তে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি অভিনয় জগতেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় তার বিচরণ তাকে একজন বহুমাত্রিক প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য নিরলস কাজ
সংগীতচর্চার পাশাপাশি তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত। চট্টগ্রাম সাংস্কৃতিক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কৃতিচর্চা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, শিল্প ও সংস্কৃতিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তার নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সৃজনশীল চিন্তাধারা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
মানবিকতার আরেক নাম শহীদ ফারুকী
একজন শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় শুধু তার শিল্পকর্মে নয়, মানবিক কর্মকাণ্ডেও প্রতিফলিত হয়। এই দিক থেকেও শহীদ ফারুকী একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক মানের পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কর্মক্ষেত্রে আন্তরিকতা, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং সেবামূলক মনোভাব তাকে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করার কারণে তিনি একজন মানবিক মানুষ হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে তিনি নীরবে কাজ করে চলেছেন।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা
বর্তমান সময়ে যখন সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন শহীদ ফারুকীর মতো ব্যক্তিত্ব সমাজের জন্য আশার আলো হয়ে উঠতে পারেন। তার অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব আগামী দিনে চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।
নতুন শিল্পী তৈরিতে ভূমিকা রাখা, চট্টগ্রামের গানের ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা এবং মানবিক সমাজ গঠনে অবদান রাখার মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন বলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা মনে করেন।
সংগীত, সংস্কৃতি, মানবতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অপূর্ব সমন্বয়ের নাম শহীদ ফারুকী। তিনি শুধু পটিয়ার গর্ব নন, তিনি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একজন উজ্জ্বল প্রতিনিধি। তার সাফল্যের পথ আরও দীর্ঘ হোক, সমাজ ও সংস্কৃতির কল্যাণে তার অবদান আরও বিস্তৃত হোক, এমন প্রত্যাশাই সবার।
Leave a Reply