1. news@dainikchattogramerkhabor.com : Admin Admin : Admin Admin
  2. info@dainikchattogramerkhabor.com : admin :
মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:০৭ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
ক্বিরাতুল কুরআন মডার্ণ হিফজ মাদরাসার অভিভাবক সমাবেশ সম্পন্ন ”নৈতিক শিক্ষায় গড়ি সুন্দর ভবিষ্যৎ” প্রিয়নবীর শুভাগমন এবং তাঁর জীবনাদর্শ  – আতিয়া নুর আফরা বোয়ালখালীর সাবেক কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম আর নেই মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ছিলেন আদর্শিক রাজনীতির বরপুত্র ও ইতিহাসের অংশ – তসলিম উদ্দীন রানা “বাংলাদেশ লিওদিবস-২০২৬: যুব সমাজ নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা”  -লায়ন ডাঃ এম.জাকিরুল ইসলাম পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর শিক্ষা ও তাৎপর্য মাওলানা এম. সোলাইমান কাসেমী “পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী ও জশনে জুলুস উদযাপনের গুরুত্ব-তাৎপর্য ” মাওলানা মুহাম্মদ বোরহান উদ্দীন কাদেরী পটিয়ায় জশনে ঈদে মিলাদুন্নবী ও নাতে মোস্তফা মাহফিল অনুষ্ঠিত ভেজাল-অনিয়মে ফ্লেভারস-মেরিডিয়ানসহ চার প্রতিষ্ঠানকে ৪০ লক্ষ টাকা জরিমানা রজভীয়া নুরীয়া কমিটি বাংলাদেশ পটিয়া উপজেলা পূর্ব পরিষদ গঠিত

প্রিয়নবীর শুভাগমন এবং তাঁর জীবনাদর্শ  – আতিয়া নুর আফরা

  • সময় মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৫ পঠিত
হে নবী আমি আপনাকে রহমাতুল্লিল আলামীন হিসেবে প্রেরণ করেছি।(আল কুরআন) যখন পৃথিবীর বুকে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও অন্যায়ের অন্ধকার ক্রমেই ঘন হয়ে উঠেছিল, যখন মানুষের হৃদয় সত্যের আলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল—তখন মানবতার দিগন্তে উদিত হয় এক অনন্য আলোকবর্তিকা। তিনি হলেন হযরত মুহাম্মদ (দ.)—মহান আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রসূল। যাঁর আগমনে মানবজীবন লাভ করে সত্য, ন্যায় ও হেদায়তের নতুন দিশা।
তাঁর আগমনের পূর্বে আরব সমাজে মূর্তিপূজা, গোত্রীয় হিংসা, অন্যায়, কুসংস্কার ও নানা সামাজিক অবিচার গভীরভাবে শেকড় গেড়ে বসেছিল। শক্তিশালী ও দুর্বল, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ছিল তীব্র বৈষম্য। এমন এক অন্ধকার সময়ে তিনি মানুষকে আহ্বান জানালেন এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে, সত্য ও ন্যায়ের পথে এবং সুন্দর চরিত্র ও মানবতার দিকে।
শৈশব থেকেই তাঁর জীবনে ফুটে উঠেছিল সততা, পবিত্রতা ও বিশ্বস্ততার ছাপ। তাই নবুওয়াত প্রকাশের পূর্বেই মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ উপাধিতে ভূষিত করে। রসূল (দ.)-এর বয়স যখন চল্লিশ বছর, তখন হেরা গুহায় প্রথম ওহি নাযিল হওয়ার মাধ্যমে নবুওয়াত প্রকাশ পায়। এরপর শুরু হয় সত্যের পথে দাওয়াতের এক দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রা। সেই যাত্রায় ছিল বিরোধিতা, নির্যাতন, বিচ্ছেদ ও অসংখ্য পরীক্ষা; কিন্তু ছিল না তাঁর দৃঢ়তার কোনো কমতি। মক্কার নির্যাতন থেকে মদিনায় হিজরত, সেখানে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা, বিদায় হজের ঐতিহাসিক ঘোষণা এবং জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত উম্মতের কল্যাণের চিন্তা—তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন সত্য ও আদর্শের একেকটি উজ্জ্বল পাঠ।
তাই তাঁর জীবন শুধু ইতিহাসের কোনো অধ্যায় নয়; এটি এমন এক জীবন, যেখানে অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে ইবাদতের সঙ্গে মানবতার, দাওয়াতের সঙ্গে ধৈর্যের, নেতৃত্বের সঙ্গে ন্যায়বিচারের এবং শক্তির সঙ্গে ক্ষমার। তাঁর জীবনকে যত গভীরভাবে জানা যায়, ততই উপলব্ধি করা যায়—কেন আজও তিনি কোটি মানুষের হৃদয়ের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও অনুসরণের সর্বোচ্চ স্থান দখলকারী।
[  ]  জন্ম ও বংশপরিচয় :
মানব সভ্যতার ইতিহাসের যে মহামানবের আগমনে পৃথিবীর গতিপথ বদলে গিয়েছিল, সেই মহামানব হযরত মুহাম্মদ (দ.) মক্কা নগরীতে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মাতার নাম আমিনা বিনতে ওয়াহাব। তাঁর পিতা তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন, ফলে তিনি জন্মেই পিতৃহারা হন।
তিনি কুরাইশ বংশের বনু হাশিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। রসূল (দ.)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব ছিলেন মক্কার একজন সম্মানিত নেতা। তিনি তাঁর নাতিকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। মায়ের ইন্তেকালের পর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁর দেখাশোনা করেন এবং পরবর্তীতে দাদার মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিব তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তাঁর জন্মের সময় আরব সমাজে মূর্তিপূজা, গোত্রীয় অহংকার, সামাজিক বৈষম্য ও নানা অনাচার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এমন এক প্রতিকূল পরিবেশেই তাঁর শৈশবের সূচনা হয়।
[  ]  শৈশব ও কৈশোর :
শৈশবেই হযরত মুহাম্মদ (দ.) জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তৎকালীন আরবের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তিনি কিছু সময়ের জন্য দুধমা হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে লালিত-পালিত হন। দুধমাতা হযরত হালিমার গৃহে অবস্থানকালে মাত্র চার বছর বয়সে রসূল (দ.)-এর বক্ষ বিদীর্ণ করার ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে তিনি হযরত মা আমেনার কাছে ফিরে আসেন এবং তাঁর স্নেহছায়ায় বেড়ে ওঠেন।
কিন্তু শৈশবের এই আনন্দময় সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি মায়ের সাথে মদিনায় পিতার কবর জিয়ারত করতে যান এবং সেখান থেকে ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে তাঁর মা ইন্তেকাল করেন। এরপর দাদা তাঁকে নিজের স্নেহ ও যত্নে লালন-পালন করেন। কিন্তু এই আশ্রয়ও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। প্রায় আট বছর বয়সে তিনি দাদাকেও হারান। দাদার মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিব তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শৈশবে একের পর এক প্রিয়জন হারানোর বেদনা তাঁর কোমল হৃদয়কে আরও সংবেদনশীল করে তোলে, ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি এতিম, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে শেখেন।
চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে আসার পর তিনি চাচার সঙ্গে ব্যবসায়িক কাজে যুক্ত হন এবং মানুষের সঙ্গে সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে লেনদেন করতেন। তাঁর সুন্দর আচরণ, সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতা মক্কার মানুষের মনে তাঁর জন্য গভীর শ্রদ্ধা সৃষ্টি করে। যার কারণে তিনি মানুষের কাছে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
[  ]  চরিত্র ও নৈতিকতা :
রসূল (দ.) ছিলেন সত্য, পবিত্রতা, দয়া ও ন্যায়পরায়ণতার এক অনুপম আদর্শ। নবুওয়াত প্রকাশের পূর্বেই তাঁর জীবন ছিল সকল প্রকার অন্যায় ও অসৎ কাজ থেকে মুক্ত। তিনি মানুষের সাথে সর্বদা কোমল ও মার্জিত আচরণ করতেন এবং কারও প্রতি কখনো অহংকার বা অবজ্ঞা প্রকাশ করতেন না। তাঁর ব্যক্তিত্বে এমন এক সৌন্দর্য প্রকাশ পেত, যা মানুষের মনে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা সৃষ্টি করত।
তাঁর চরিত্রের অন্যতম উজ্জ্বল দিক ছিল দয়া ও ক্ষমাশীলতা। তিনি শিশুদের প্রতি স্নেহশীল, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং দুর্বলদের অধিকারের প্রতি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। যারা তাঁর প্রতি অন্যায় আচরণ করত, ব্যক্তিগত জীবনে তাঁদের প্রতিও তিনি ক্ষমার পথ বেছে নিতেন।
সকল প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি ধৈর্য ধারণ করতেন এবং মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করতেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর সুমহান চরিত্রের প্রশংসা করে বলেন—«“নিশ্চয় আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী।” (সূরা আল-কলম: ৪)»
তাঁর কোমল ও মানবিক আচরণ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন—«“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন।” (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)»
তাঁর জীবনে সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, ধৈর্য, ক্ষমা, বিনয় ও ন্যায়বিচার শুধু মুখের কথা ছিল না; বরং তিনি নিজ জীবনে এসব গুণের বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাই তাঁর চরিত্র ছিল এমন এক আদর্শ, যার মাধ্যমে একজন মানুষ কীভাবে আল্লাহভীরু, ন্যায়পরায়ণ ও মানবিক হতে পারে তার সুন্দর শিক্ষা পাওয়া যায়।
রসূল (দ.)-এর চরিত্রের এই মহত্বই তাঁর দাওয়াতকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে যে সামঞ্জস্য ছিল, তা মানুষকে তাঁর প্রতি আস্থা রাখতে এবং সত্যের পথে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
[  ]  ধর্মীয় ও দাওয়াতি জীবন:
হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তাঁর ধর্মীয় ও দাওয়াতি জীবন। চল্লিশ বছর বয়সে নবুওয়াত প্রকাশের পর তিনি মানুষের কাছে আল্লাহর একত্ববাদের বাণী পৌঁছে দেওয়ার মহান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর দাওয়াতের মূল ভিত্তি ছিল ‘তাওহীদ’—একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করা। এর পাশাপাশি মানুষকে তিনি সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, আমানতদারিতা, পবিত্রতা, দয়া ও মানুষের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দিতেন।
১-নবুওয়াত প্রকাশ ও ওহির সূচনা:
হযরত মুহাম্মদ (দ.) নবুওয়াত প্রকাশের পূর্বে মক্কার অদূরে অবস্থিত হেরা গুহায় নির্জনে সময় কাটাতেন। ৬১০ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর চল্লিশ বছর বয়সে একদা ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহি নিয়ে আগমন করেন। ‘সূরা আলাক’-এর প্রথম পাঁচ আয়াত নাজিলের মাধ্যমে শুরু হয় আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রসূলের ওহির সূচনা। প্রথম ওহি নাজিলের পর রসূল (দ.) গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়লে ঘরে ফিরে আসেন। হযরত খাদিজা (রা.) তাঁকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন এবং রসূল (দ.)-এর উত্তম চরিত্র ও গুণাবলির কথা স্মরণ করিয়ে সাহস জোগান। পরে ওয়ারাকা বিন নওফলের কাছে গেলে তিনি ঘটনাটি শুনে জানান যে, রসূল (দ.)-এর নিকট যিনি এসেছেন, তিনি হলেন সেই ফেরেশতা যিনি পূর্ববর্তী নবীদের নিকট আল্লাহর ওহি নিয়ে এসেছেন। নবুওয়াত লাভের মাধ্যমে রসূল (দ.) এর ওপর অর্পিত হয় আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বানের মহান দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই তাঁর দীর্ঘ ও কঠিন দাওয়াতি জীবনের সূচনা হয়।
২-ইসলামের দাওয়াতের সূচনা:
 নবুওয়াত লাভের পর রসূল (দ.) প্রথমে তাঁর নিকটজন ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের ইসলামের দিকে আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে হযরত খাদিজা (রা.), হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), হযরত আলী (রা.) ও যায়েদ বিন হারেসা (রা.)-সহ একদল মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবেই মক্কার বুকে ইসলামের ছোট্ট কাফেলার যাত্রা শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে মুসলমানরা গোপনে ইবাদত ও দীনের শিক্ষা গ্রহণ করতেন। মক্কার দারুল আরকাম ছিল ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষাদান ও সমবেত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। পরবর্তীতে রসূলুল্লাহ (দ.) আল্লাহর নির্দেশে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তিনি মানুষকে মূর্তিপূজা ত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান, একই সঙ্গে তিনি মিথ্যা, প্রতারণা, শোষণ ও অন্যায় থেকে দূরে থেকে সত্য, ন্যায়, সাম্য ও মানবতার পথে চলার শিক্ষা দেন।
৩-কুরাইশদের বিরোধিতা ও নির্যাতন:
 ইসলামের দাওয়াত প্রকাশ্যে ছড়িয়ে পড়লে কুরাইশ নেতারা রসূলে আকরাম (দ.) এর তীব্র বিরোধিতা শুরু করে। কারণ, তাঁর তাওহীদের আহ্বান তাদের প্রচলিত মূর্তিপূজা, গোত্রীয় প্রথা, অহংকার ও নানা অন্যায় প্রথার বিরুদ্ধে ছিল। তারা কখনো তাঁকে নানা অপবাদ দিয়ে মানুষের কাছে তাঁর দাওয়াতকে দুর্বল করার চেষ্টা করত। আবার কখনো সম্পদ, নেতৃত্ব ও সম্মানের প্রস্তাব দিয়ে তাঁকে দাওয়াত থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু সত্যের এই মহান আহ্বায়ক কোনো প্রলোভন বা বাধার কাছে নতি স্বীকার করেননি। ইসলামের নবীন অনুসারীদের ওপরও তৎকালীন বিরোধী শক্তি নানা ধরনের নির্যাতন চালাতে থাকে, বিশেষ করে দুর্বল ও অসহায় সাহাবিদের ইসলাম ত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হতো। এত অত্যাচার ও নির্যাতনের পরও কোনো সুফল না মিললে তারা একপর্যায়ে নবগঠিত মুসলিম সমাজকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করে। এই অব্যাহত বিরোধিতার মধ্যেও তিনি মক্কার বাইরে ইসলামের বাণী পৌঁছাতে সচেষ্ট ছিলেন। এক ধারাবাহিকতায় তিনি তায়েফ গমন করেন এবং পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হলে আল্লাহর নির্দেশে মদিনায় হিজরতের পথ উন্মুক্ত হয়।
৪-তায়েফ সফর:
 মক্কায় দাওয়াতের পথ কঠিন হয়ে উঠলে রসূল (দ.) ইসলামের বাণী পৌঁছাতে তায়েফ গমন করেন। কিন্তু তায়েফের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেন৭ এবং তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এত কষ্ট ও প্রত্যাখ্যানের পরও তিনি তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেননি; বরং তাদের বংশধরদের হেদায়েতের আশা প্রকাশ করেন। তায়েফের ঘটনা মহানবীর অসীম ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও মানবপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি আমাদের শিখায়, প্রত্যাখ্যান বা কষ্ট এলেও হতাশ না হয়ে মানুষের হেদায়েতের আশা ধরে রাখতে হয়।
৫ আকাবার শপথ:
 তায়েফ সফরের পরও রসূল (দ.) ইসলামের দাওয়াত থেকে বিরত হননি। মক্কার বাইরে বিভিন্ন গোত্রের মানুষের কাছে তিনি ইসলামের বাণী পৌঁছে দিতে থাকেন। এই সময় ইয়াসরিবের (মদিনার) কিছু লোক তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করে এবং নিজ শহরে ফিরে গিয়ে অন্যদেরও ইসলামের দিকে আহ্বান জানায়। পরবর্তীতে মদিনার একদল মানুষ ‘আকাবা’ নামক স্থানে রসূল (দ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁকে সাহায্য-সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেন। এই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে ‘আকাবার শপথ’ নামে পরিচিত। আকাবার শপথের মাধ্যমে মদিনায় ইসলামের জন্য একটি নিরাপদ ও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়, পরবর্তীতে এটাই মুসলমানদের হিজরত এবং মদিনায় ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করে।
৬- মদিনায় হিজরত ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা:
মক্কায় কুরাইশদের অত্যাচার যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায় এবং মদিনায় ইসলামের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়, তখন মুসলমানরা আল্লাহর নির্দেশে পাড়ি জমায় মদিনার পথে। অবশেষে রসূল (দ.) ও সিদ্দিকে আকবর হযরত আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মদিনায় হিজরত করেন। পথিমধ্যে তাঁরা সাওর পর্বতে আশ্রয় নিলে কুরাইশরা তাঁদের খুঁজতে খুঁজতে পর্বতের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এমতাবস্থায় সিদ্দিকে আকবর হযরত আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে রসূলুল্লাহ (দ.) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন— «“হে আবু বকর! সেই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয়জন আল্লাহ?”
(সহিহ বুখারী, হাদিস নং: ৩৬৫৩)»
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত শুধুমাত্র স্থান পরিবর্তন ছিল না, বরং ছিল আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের জন্য ত্যাগ, আত্মসংযম এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মদিনায় পৌঁছানোর পর সেখানে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে, এক সত্যের নির্ভীক প্রচারক হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (দ.) ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতাবিধিত সমাজ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। এর জন্য সর্বপ্রথম তিনি মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা করেন, যা ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা, পরামর্শ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এরপর তিনি মুহাজির ও আনসারদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন এবং মদিনার আরও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রণয়ন করেন ‘মদিনা সনদ’, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পায় ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানুষের মর্যাদা।
৭-বিদায় হজ ও এর ঐতিহাসিক ভাষণ:
 রহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জীবনের শেষ পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ‘বিদায় হজ’। হিজরি দশম বছরের হজ ছিল তাঁর জীবনের শেষ হজ, এবং এই সময় বিপুলসংখ্যক সাহাবি তাঁর সঙ্গে ছিলেন। বিদায় হজের সময় তিনি মুসলমানদের পারস্পরিক অধিকার, মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা, নারীর প্রতি সদাচরণ ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন। রসূল (দ.) মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের পবিত্রতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন— «“তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সম্মান তোমাদের জন্য পবিত্র, যেমন পবিত্র এই দিন, এই মাস ও এই নগরী।” (সহিহ বুখারী: ১৭৩৯)»
বিদায় হজ ছিল তাঁর দাওয়াতি জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সমাপ্তি। তাঁর জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের পর এই হজে ইসলামের শিক্ষা একটি বৃহৎ সমাবেশের সামনে তুলে ধরা হয়। বিদায় হজে আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত বিপুলসংখ্যক সাহাবির সামনে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন, যে ভাষণে তিনি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন যে একজন মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন অপরিহার্য। তিনি ঘোষণা দেন জাহেলি যুগের রক্তের প্রতিশোধ ও সুদের মতো অন্যায় প্রথা বাতিলের। নারীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ ও তাদের অধিকার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে ন্যায়, ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহভীতির গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রকাশ পায়। মানুষের মর্যাদা ও সমতার বিষয়ে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে— «“হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো।”
(সূরা হুজরাত: ১৩)»
বিদায় হজের ভাষণ শুধু সেই সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তাঁর এই ভাষণ মানবতার প্রতি দায়িত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দিকনির্দেশনা হয়ে আছে। তাই বিদায় হজ উম্মতে মুহাম্মদীর জীবনে শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং ন্যায়, মানবমর্যাদা, পারস্পরিক অধিকার ও আল্লাহভীতির এক চিরন্তন শিক্ষা।
[  ]  ইন্তেকাল শরীফ:
হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর দুনিয়াবী জীবনের শেষ সময়টিও ছিল তাঁর উম্মতের জন্য শিক্ষা ও দিকনির্দেশনায় পরিপূর্ণ। বিদায়ী হজের পর তিনি মদিনায় ফিরে আসেন এবং জীবনের শেষ দিনগুলোতে সাহাবিদের সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া, মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং পরস্পরের সঙ্গে সদাচরণ করার শিক্ষা দিতেন। জীবনের শেষদিকে তাঁর অসুস্থতা বৃদ্ধি পায়। তবে অসুস্থ অবস্থাতেও আল্লাহর প্রিয় হাবিব (দ.) উম্মতের কল্যাণ নিয়ে চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। অবশেষে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার ইন্তেকাল করেন।  তাঁর ওফাতে সাহাবিগণ গভীরভাবে ভেঙে পড়েন। তবে রহমাতুল্লিল আলামিন প্রিয় রসূল (দ.)-এর ইন্তেকাল হলেও তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও সুন্নাহর, যা আজও সত্য-ন্যায়, ইবাদত-রিয়াজত, মানবতা ও উত্তম চরিত্র গঠনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
[  ] তাঁর জীবনের শিক্ষা ও আমাদের করণীয় :
হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জীবন আমাদের জন্য এক পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বিদ্যমান। তিনি তাঁর শিক্ষা শুধু কথার মাধ্যমে দেননি, বরং বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন নিজ জীবনেই। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিক্ষা পাই সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতার, যা একজন প্রকৃত মানুষের চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতার ধারক-বাহক। মহানবীর জীবন আমাদের আরও শিক্ষা দেয় ক্ষমা ও মানবতার, ধৈর্য ও দৃঢ়তার। মক্কার দীর্ঘ নির্যাতন, তায়েফের প্রত্যাখ্যান এবং নানা প্রতিকূলতার সত্ত্বেও তিনি ইসলামের দাওয়াত থেকে বিরত হননি। পাশাপাশি তিনি ছিলেন এতিম, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি বিশেষ যত্নশীল। ফলে আমাদেরও উচিত মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল, ক্ষমাশীল ও কল্যাণকারী হওয়া। সর্বোপরি, রহমাতুল্লিল আলামিন আমাদের শেখায়—আল্লাহর প্রতি ইমান, ইবাদত, উত্তম চরিত্র, মানুষের কল্যাণচিন্তা, অন্যের অধিকার রক্ষা এবং সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা।
উপসংহার :
হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জীবন মানবজাতির জন্য এক মহান অনুসরণীয় আদর্শ। তাঁর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে সত্য, ন্যায়, দয়া, ক্ষমা, আমানতদারি ও মানবতার এক সুমহান শিক্ষা। তিনি এমন এক সমাজে সত্যের বাণী নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যেখানে মানুষের জীবন ছিল অন্যায় ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। তাঁর অবিচল দাওয়াত, ত্যাগ ও আদর্শের মাধ্যমে সেই সমাজে সূচনা হয় নৈতিকতা ও মানবিকতার। তিনি ছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রসূল, রহমাতুল্লিল আলামিন, সায়্যিদুল মুরসালিন, একই সঙ্গে এক আদর্শ শিক্ষক, ন্যায়পরায়ণ নেতা, স্নেহশীল অভিভাবক এবং মানবতার কল্যাণকামী পথপ্রদর্শক। আজকের এই আধুনিক পৃথিবীতে তাঁর শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার রক্ষা, অন্যায় ও বৈষম্য দূর করা এবং পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি গড়ে তুলতে তাঁর আদর্শ আমাদের পথ দেখায়। তাই তাঁর জীবন শুধু পড়ে জানাই যথেষ্ট নয়, বরং তাঁর দেওয়া শিক্ষা ও সুন্নাহকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করাই হওয়া উচিত আমাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য।
লেখিকা_শিক্ষার্থী: জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা কামিল মাদরাসা, ষোলশহর, চট্টগ্রাম।

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
কপিরাইট © ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট