
চিকিৎসক, শিক্ষক, সংগঠক ও প্রশাসক—দীর্ঘ পথচলার এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প “চিকিৎসা শুধু একটি পেশা নয়—এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি অঙ্গীকার।” এই বিশ্বাসকে ধারণ করে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসা শিক্ষা, সংগঠন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন অধ্যাপক ডা. কামরুন নেসা (রুনা)।
চট্টগ্রামের চিকিৎসাঙ্গনে তিনি পরিচিত একজন অভিজ্ঞ স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও সংগঠক হিসেবে। আর এখন তাঁর কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে তিনি এই নতুন দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন।
শিকড় পটিয়ায়:
১৯৬২ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন অধ্যাপক ডা. কামরুন নেসা রুনা। সরকারী চাকুরীজীবি পিতার ১০ সন্তানের মধ্যে তিনি সপ্তম। বাকী ভাইবোনেরা ও শিক্ষিত ও স্ব স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেনীতে মেধা তালিকায় সরকারি বৃত্তি লাভ ও ১৯৭৭ সালে ফয়জুন্নেসা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, কুমিল্লা থেকে বিজ্ঞানে প্রথম বিভাগে এসএসসি এবং ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম নাসিরাবাদ মহিলা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করেন।
এরপর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। ১৯৮৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ চিকিৎসক-জীবন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৯৪ সালে MCPS (Gynae & Obs), ১৯৯৬ সালে DGO এবং ২০০৫–২০০৬ সেশনে MS in Gynaecology অর্জন করেন।
চিকিৎসাসেবা থেকে অধ্যাপনা:
কর্মজীবনের শুরুতে দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করে অর্জন করেন বিস্তৃত বাস্তব অভিজ্ঞতা। পটিয়া-আনোয়ারা মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করা থেকে পিজি হাসপাতালে প্রয়াত স্বনামধন্য কিংবদন্তি চিকিৎসক প্রফেসর টিএ চৌধুরীর সাথে সহকারী রেজিস্ট্রার ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়াত প্রফেসর তাহের খানের সাথে রেজিস্ট্রার ও রেসিডেন্ট সার্জন, ধোবাউড়ায় জুনিয়র কনসালটেন্ট এবং বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে সিনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। সেখানে গাইনী ও অবস বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক এবং পরবর্তীতে অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন।
অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ার পরও থেমে থাকেননি। USTC মেডিকেল কলেজে গাইনী বিভাগে বিভাগীয় প্রধান এবং পরবর্তীতে মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজে গাইনীর অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অত:পর ২০২৩ সালে মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পান। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি একই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
পেশাগত সংগঠনে দৃঢ় নেতৃত্ব:
চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি পেশাজীবী সংগঠনেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। চট্টগ্রাম অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটির ফাউন্ডার সদস্যদের একজন হিসেবে যাত্রা শুরু করে সংগঠনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যেমন কোষাধ্যক্ষ, মহাসচিব ইত্যাদি পদে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দেওয়ার পর OGSB Chattogram Branch-এর President হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।
বাংলাদেশের জাতীয় সংগঠন OGSB-এর নির্বাচিত Vice President হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি OGSB Legal Committee-এর Chairperson হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন—চিকিৎসকদের পেশাগত ও আইনগত সচেতনতা বৃদ্ধিতে যে দায়িত্বটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও নেতৃত্ব :
দেশের সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর পেশাগত সম্পৃক্ততা বিস্তৃত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার পরিসরেও। South Asian Federation of Obstetrics and Gynaecology (SAFOG)-এর ২০২৬–২০২৭ মেয়াদের Councilor হিসেবে বাংলাদেশ থেকে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন অধ্যাপক কামরুন নেসা। এছাড়া International Federation of Gynaecologist & Obstetricians ( FIGO) এর Master Trainer হিসেবে প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। FIGO POIUD প্রকল্পের সাথে ও তিনি যুক্ত ছিলেন। মাতৃমৃত্যু কমাতে দক্ষতা উন্নয়ন ও মানসম্মত প্রসূতি সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই তাঁর এই প্রচেষ্টা।
চিকিৎসার পাশাপাশি সমাজের জন্য মানুষের জন্য কাজ করার পরিধি শুধু হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চট্টগ্রাম মা ও শিশু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের লাইফ মেম্বার, ডেনার মেম্বার এবং নির্বাচিত এক্সিকিউটিভ মেম্বার হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া রোজ গার্ডেন রেটারী ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছেন। নিজ এলাকা পটিয়ার হুলাইন-পাইরোল-এয়াকুব দন্ডী স্কুলের ডোনার মেম্বার হিসেবেও শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখছেন।
ব্যস্ততার মাঝেও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা এত ব্যস্ত কর্মজীবনের মধ্যে:ও অধ্যাপক ডা. কামরুন নেসা রুনার রয়েছে একটি সুন্দর সাংস্কৃতিক জগৎ। তিনি গান গাইতে, কবিতা আবৃত্তি করতে এবং গল্পের বই পড়তে ভালোবাসেন। বিটিভিতে তিনি স্বাস্হ্য কথা অনুষ্ঠানে হোষ্ট হিসাবে কাজ করেছেন। নতুন দেশ, নতুন মানুষ ও নতুন সংস্কৃতিকে জানার আগ্রহ থেকে দেশ বিদেশ ভ্রমণ ও তাঁর অন্যতম প্রিয় শখ।
পরিবার:
তাঁর শক্তির অন্যতম উৎস
ব্যক্তিজীবনে তিনি একটি চিকিৎসক ও পেশাজীবী পরিবারের অভিভাবক। তাঁর স্বামী ডা. সালেহউদ্দীন আহমদ, একজন স্বানামধন্য অর্থোপেডিক সার্জন। তাঁদের দুই পুত্রের মধ্যে ডা. আদনান বিন সালেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে ইমপেরিয়াল হাসপাতালে কর্মরত এবং ব্যারিস্টার আশিক সাদমান ঢাকা হাইকোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত। কন্যা সামিয়া নওশীন IUT-এর Software Engineering-এর গোল্ড মেডেলিস্ট এবং বর্তমানে IUT-তে Faculty হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন।
নতুন দায়িত্ব, নতুন প্রত্যয়:
মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি নতুন মাইলফলক। একজন চিকিৎসক হিসেবে রোগীর পাশে থাকা, একজন শিক্ষক হিসেবে প্রজন্মকে গড়ে তোলা, একজন সংগঠক হিসেবে পেশাজীবীদের নেতৃত্ব দেওয়া এবং একজন প্রশাসক হিসেবে একটি মেডিকেল কলেজকে এগিয়ে নেওয়া—এই চারটি পরিচয়ের সমন্বয়ই অধ্যাপক কামরুন নেসার দীর্ঘ পথচলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
তাঁর সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ—একটি মানসম্মত, মানবিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও একাডেমিকভাবে সমৃদ্ধ মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলা।
চট্টগ্রামের চিকিৎসা শিক্ষাঙ্গনে তাঁর নতুন দায়িত্ব তাই শুধু একটি পদে আসীন হওয়ার ঘটনা নয়; বরং অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের হাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিকিৎসকদের গড়ে তোলার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
অধ্যাপক ডা. কামরুন নেসা রুনার এই নতুন পথচলায় রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।
Leave a Reply