
বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দীর্ঘদিনের একমেরু বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থাকলেও ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা এবং ব্রিকসের বিস্তারের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বহুমুখিতার নতুন প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য, বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকতর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও গুরুত্ব পাচ্ছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়বে। জ্বালানি মূল্য, খাদ্যপণ্য, রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজার আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের কাজান সম্মেলনের পর ব্রিকসের অংশীদার দেশ হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যদিও বাংলাদেশ এখনো ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য নয়, এই আমন্ত্রণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গুরুত্বের একটি দিক নির্দেশ করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্রিকসের New Development Bank-এর সদস্য, যা উন্নয়ন অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ব্রিকসের সঙ্গে এই সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে বাস্তবতা, সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকি এবং সর্বোপরি জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও তাকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একদিকে ভারত ও চীন, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর ও মিয়ানমার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার, চীনের সঙ্গে রয়েছে বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা, ভারতের সঙ্গে রয়েছে ঐতিহাসিক ও প্রতিবেশী সম্পর্ক এবং রাশিয়ার সঙ্গে রয়েছে জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। তাই বাংলাদেশের পথ কোনো একটি শক্তির ছায়ায় নয়, বরং সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। বন্ধুত্বের পরিধি বাড়াতে হবে, কিন্তু নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে হবে।
ব্রিকস বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার সক্ষমতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাও জরুরি। রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রসম্পদ, খাদ্য নিরাপত্তা ও অভিবাসনের মতো বিষয়েও বাংলাদেশকে বহুপক্ষীয় কূটনীতি আরও জোরদার করতে হবে। কারণ অর্থনৈতিক শক্তি যত বাড়বে, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বাধীনতাও তত শক্তিশালী হবে।
বিশ্বের শক্তির সমীকরণ যতই বদলাক, বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত শান্তিপূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ ও আত্মমর্যাদাশীল। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া, ইউরোপসহ সবার সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু প্রতিটি সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বাংলাদেশ। কোনো জোটের অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং দূরদর্শী কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে। কারণ পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো পরাশক্তির ছায়া নয়, বরং নিজের জাতীয় স্বার্থ, জনগণের কল্যাণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার সক্ষমতা।
লেখক পরিচিতি: কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক।
Leave a Reply