1. news@dainikchattogramerkhabor.com : Admin Admin : Admin Admin
  2. info@dainikchattogramerkhabor.com : admin :
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৫ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
মখলেছুর রহমান চৌধুরী- আলতাজ খাতুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পুরস্কার বিতরণ ও এসএসসি বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত। কবে মিলবে যানজটের মুক্তি: ভাল নেই চট্টগ্রামবাসী -আলমগীর আলম। পটিয়া লাখেরা উচ্চ বিদ্যালয়ে অবসরকালীন সংবর্ধনা ও মেধাবৃত্তি সনদ বিতরণ। মানবতার কাজে এগিয়ে এপেক্স বাংলাদেশ:সাচিং প্রু জেরী এমপি। বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফি: র‍্যাবের জালে মূলহোতা তোফাজ্জলসহ গ্রেফতার ২ শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বোয়ালখালীতে এমআর ক্যাম্পেইন স্বপ্ন থেকে সহিংসতায়: কিশোর জীবনের করুণ রূপান্তর – লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া দুবাইয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতা প্রকৌশলী আবু জাফর চৌধুরীর ইন্তেকাল সীতাকুণ্ডে বিশেষ হাম ক্যাম্পইন ২০ এপ্রিল ওষখাইন রজায়ী দরবার শরীফে ১১ মে বার্ষিক ফাতেহা শরীফ অনুষ্ঠিত হবে

স্বপ্ন থেকে সহিংসতায়: কিশোর জীবনের করুণ রূপান্তর – লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া

  • সময় বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪১ পঠিত

 

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নগরজীবনে এক নীরব অথচ গভীর আতঙ্ক হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও সিলেটসহ বড় শহরগুলোর অলিগলি আজ যেন এক অদৃশ্য ভয় আর অনিশ্চয়তার ছায়ায় আচ্ছন্ন। যে বয়সে কিশোরদের হাতে থাকার কথা ছিল বই, খাতা আর স্বপ্নের রংতুলি; সে বয়সেই আজ অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক বাণিজ্য এবং সংঘবদ্ধ সহিংসতার অন্ধকার জগতে। তাদের হাসি-খুশি শৈশব যেন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে এক কঠিন, নিষ্ঠুর বাস্তবতার গল্পে। ফলে এটি আর কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের সামাজিক ব্যর্থতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হারানোর এক গভীর আশঙ্কার নাম।

কিশোর গ্যাংয়ের উৎপত্তি ও বিস্তারের পেছনে লুকিয়ে আছে এক জটিল ও বহুস্তরীয় সামাজিক বাস্তবতা। দ্রুত নগরায়ণের ফলে ভেঙে পড়ছে পারিবারিক বন্ধনের উষ্ণতা; ব্যস্ত জীবনের চাপে অভিভাবকেরা অনেক সময় সন্তানের মানসিক জগতকে ঠিকভাবে স্পর্শ করতে পারছেন না। সেই অবহেলা ও শূন্যতার নিঃশব্দ গভীরে জন্ম নিচ্ছে এক ধরনের একাকীত্ব, যা ধীরে ধীরে কিশোরদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে পরিবার থেকে। এই ফাঁকা জায়গাটিই দখল করছে সমবয়সীদের ভুল প্রভাব, যেখানে প্রশংসা ও স্বীকৃতির মোহে অনেকেই সহজেই জড়িয়ে পড়ছে গ্যাং সংস্কৃতির অন্ধকারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভয়াবহ অপব্যবহার। ভার্চুয়াল দুনিয়ার প্রদর্শন, মুহূর্তের জনপ্রিয়তা আর ‘ভয়ংকর ইমেজ’ তৈরির প্রতিযোগিতা অনেক কিশোরের কাছে গ্যাং কালচারকে এক ধরনের বিভ্রান্তিকর আকর্ষণে পরিণত করেছে। ফেসবুক লাইভ, টিকটক ভিডিও কিংবা গোপন অনলাইন গ্রুপে শক্তি প্রদর্শন, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো বা আধিপত্যের গল্প ছড়ানো; এসবই তাদের কাছে যেন বাস্তব জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে এই ভার্চুয়াল প্রদর্শনই তাদের বাস্তব জীবনের সহিংস আচরণকে উসকে দিচ্ছে, যা একসময় তাদের ঠেলে দিচ্ছে অপরাধ ও বিপথগামিতার গভীর অন্ধকারে।

মাদকাসক্তিও কিশোর গ্যাং বিস্তারের অন্যতম ভয়াবহ ও নিঃশব্দ কারণ হিসেবে সমাজকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে। সহজলভ্য মাদক, বিশেষ করে ইয়াবা ও গাঁজা, অনেক কিশোরের জীবনকে অল্প বয়সেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে হাতে থাকার কথা ছিল বই, খাতা আর স্বপ্ন; সেই হাতই আজ অনেক সময় মাদক গ্রহণের অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, আর সেখান থেকেই শুরু হচ্ছে তাদের পতনের যাত্রা। মাদকের নেশা ও এর খরচ মেটাতে গিয়ে তারা ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই, চুরি কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে, যা তাদের জীবনকে আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করছে। অন্যদিকে, আরও উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল বা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র এই কোমলমতি কিশোরদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য। যাদের স্বপ্ন হওয়ার কথা ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, তারা পরিণত হচ্ছে অন্যের অপরাধের নির্বাক অংশীদারে। এভাবে একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে একটি কিশোরের জীবন, অন্যদিকে তেমনি সমাজও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে তার সম্ভাবনাময় আগামী প্রজন্মকে।

সম্প্রতি ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় দিনের আলোয় ‘এলেক্স ইমন’ নামে পরিচিত এক কিশোর গ্যাং প্রধানকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ‘এলেক্স গ্রুপ’-এর নেতৃত্বদানকারী এই কিশোরের মৃত্যু দেশব্যাপী তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ঘটনাটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির ভয়াবহতা ও আত্মঘাতী চরিত্রের নির্মম উদাহরণ।
গ্যাংভিত্তিক প্রতিশোধ, আধিপত্য বিস্তার ও ক্ষমতার লড়াই যে কতটা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। নিয়মিত গ্রেফতার, নজরদারি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চললেও বাস্তবতা হচ্ছে, এই সমস্যা এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। কারণ, কিশোর গ্যাং কেবল অপরাধ দমন দিয়ে নির্মূল করা সম্ভব নয়; এর শিকড় সমাজের গভীরে প্রোথিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং সমস্যার সমাধান কেবল তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে নয়; এর জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। প্রথম দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হবে, কারণ একটি কিশোরের প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষা তার ঘর থেকেই শুরু হয়। সন্তানের চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব, এমনকি তার নীরব পরিবর্তনগুলোও বোঝার চেষ্টা করতে হবে। “সে কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, অনলাইনে কী করছে” এই প্রশ্নগুলো শুধু নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, বরং ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই দেখা উচিত। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবিকতা, নৈতিকতা ও সহমর্মিতার বোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগতে খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়েই কিশোররা নিজেদের ইতিবাচকভাবে আবিষ্কার করতে পারে। সমাজ ও কমিউনিটির দায়িত্বও কম নয়; প্রতিটি মহল্লা যদি কিশোরদের জন্য একটি নিরাপদ, অনুপ্রেরণামূলক পরিসর গড়ে তোলে, তবে তারা সহজেই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসতে পারবে। যুব উন্নয়ন, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি তাদের জীবনের দিশা বদলে দেওয়ারও একটি শক্তিশালী উপায়।

একইসঙ্গে প্রযুক্তির এই যুগে কিশোরদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন তাদের বিভ্রান্তির কারণ না হয়ে, বরং জ্ঞানের ও ইতিবাচক সংযোগের মাধ্যম হয়, সেই পরিবেশ তৈরি করতে পরিবার, বিদ্যালয় ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সাইবার জগতে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আজ সময়ের অপরিহার্য দাবি। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই কিশোরদের আমরা কীভাবে দেখি। তারা অপরাধী নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে অবহেলা, ভুল দিকনির্দেশনা ও পরিস্থিতির শিকার পথভ্রষ্ট কিশোর। তাদের শাস্তি নয়, প্রয়োজন সহানুভূতি, পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তা। সঠিক সময়ে একটু সহমর্মিতা, একটু দিকনির্দেশনা, এই ছোট ছোট উদ্যোগই হয়তো একটি জীবনকে অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরিয়ে আনতে পারে। কারণ, এই কিশোররাই পারে আগামী দিনের একটি সুন্দর,

মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে, যদি আমরা আজ তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি।

কিশোর গ্যাং কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি আমাদের সমাজের নীরব অবক্ষয়ের এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি। যে বয়সে স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সেই আজ অনেক কিশোর হারিয়ে যাচ্ছে সহিংসতার অন্ধকারে। আজ যারা গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ছে, তারাই তো আগামী দিনের নাগরিক; তাদের পথভ্রষ্টতা মানেই আমাদের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা না গেলে একসময় এই সমাজই তার মাশুল দেবে। সময়ের দাবি শুধু আইন প্রয়োগ নয়; দরকার ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা ও সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ। নচেৎ এই নীরব বিস্ফোরণ একদিন ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ নেবে, আর স্বপ্নময় কিশোর জীবনগুলো একে একে সহিংসতার করুণ গল্পে পরিণত হবে।

লেখক পরিচিতি : কলাম লেখক ও সংগঠক; সেক্রেটারী, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিট।

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
কপিরাইট © ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট