
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এশিয়ান নারী ও শিশু অধিকার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে চট্টগ্রামে নাগরিক গোলটেবিল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট ২০২৬) বিকেল ৪টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সুলতান আহমেদ হলে “জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার: নারী ও শিশুর নিরাপত্তায় আমাদের করণীয়” শীর্ষক এ নাগরিক গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠান পরিচালনা ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এশিয়ান নারী ও শিশু অধিকার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব মোহাম্মদ আলী।
মূল প্রবন্ধে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারী ও শিশুদের ওপর সৃষ্ট বহুমাত্রিক ঝুঁকি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে মানবাধিকার সংকট হিসেবে বিবেচনা করে এর মোকাবিলায় কার্যকর, বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন **চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শুধু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। চট্টগ্রামের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ নগরীতে জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত নগর পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা দুর্যোগের সময় নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নারী ও শিশুর নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে। জলাবদ্ধতা নিরসন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলবায়ু ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, উন্নয়ন যেন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং মানুষের জীবনমান, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করাই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। নারী ও শিশুবান্ধব এবং জলবায়ু সহনশীল নগর গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বেগম রোকেয়া রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর হাসিনা যাকারিয়া বেলা।
তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নারী ও শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা তুলে ধরে নারী ও শিশুর অধিকারকে জলবায়ু নীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান।
এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন আমাদের আলোকিত সমাজের চেয়ারম্যান মো. কামরুল ইসলাম, সহকারী আবহাওয়াবিদ মোঃ আব্দুর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক উর্মি সরকার, গ্রীন এলায়েন্স এন্ড ফ্রেন্ডস-এর চেয়ারম্যান সারোয়ার আমিন বাবু, রোটারিয়ান এস এম আজিজ, মাই টিভি চট্টগ্রামের প্রধান মো. নুরুল কবির, এশিয়ান নারী ও শিশু অধিকার ফাউন্ডেশনের প্রস্তাবিত ভাইস-চেয়ারম্যান আর এস এম নিজাম উদ্দিন, যুগ্ম মহাসচিব উৎপল কুমার দাস, হাজী মো. মাইন উদ্দিন, অপরাজেয় বাংলাদেশ চট্টগ্রাম এর ইনচার্জ জিনাত আরা,অধ্যক্ষ এম এন হুছাইন, মোহাম্মদ শাহজাহান, চান্দগাঁও থানা শাখা সদস্য সচিব মোঃ আব্দুল কাদের, যুগ্ম সদস্য সচিব লাকি আক্তার,হৃদয়ের ডাক স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মোঃ আনিছুর রহমান, হেলাল উদ্দিন নোমান, মঞ্জুর আহমেদ সহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে মানবাধিকারকর্মী, সমাজকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, সংগঠক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
জলবায়ু পরিবর্তন এখন মানবাধিকার সংকট
আলোচনায় বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, শিক্ষা, খাদ্য, বাসস্থান ও জীবিকার অধিকারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে জলবায়ুজনিত দুর্যোগে নারী ও শিশুরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বন্যা, জলাবদ্ধতা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বাস্তুচ্যুতি ও দীর্ঘস্থায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বক্তারা বলেন, দুর্যোগের সময় নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমেও নারী ও শিশুর বিশেষ চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম ও সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
তারা বলেন, শুধু দুর্যোগের সময় ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা দেওয়া যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, নিরাপদ বাসস্থান, কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে নারী ও শিশুবান্ধব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অংশ
Leave a Reply