1. news@dainikchattogramerkhabor.com : Admin Admin : Admin Admin
  2. info@dainikchattogramerkhabor.com : admin :
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ০৪:১২ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
জননেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী আদর্শিক রাজনীতির বরপুত্র ও ইতিহাসের নায়কের নাম- তসলিম উদ্দীন রানা আল্লামা তৈয়্যব শাহ দ্বীনের মুজাদ্দিদ ও সফল সংগঠক ছিলেন অধ্যক্ষ মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান আলকাদেরী সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ৫ জন শনাক্ত: রাঙ্গুনিয়া’র যুবদল নেতা মাসুদ হত্যায় রাউজান থানায় মামলা যুক্তরাজ‍্যে নিষিদ্ধ সংগঠনের আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ এবং বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, ইউকে’র উদ্যোগে ‘মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা’ অনুষ্ঠিত গুম-অপহরণের ‘নাটক’ ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে বড় রদবদল, ৫ থানায় ওসিসহ ৮ কর্মকর্তার বদলি ন্যাশনাল ইংলিশ স্কুল চিটাগাং-এর উদ্যোগে ১ম সাময়িক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ ও অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত সিসিএম আই শ্রোতার আসরে প্রয়াত তবলা শিল্পী প্রদীপ নন্দীকে স্মরণ। পটিয়া আলমদার পাড়ায় মাইজভান্ডারী হক কমিটির উদ্যোগে তিন কন্যার বিয়েতে আর্থিক অনুদান। ২৫ বছর ধরে কলা বিক্রি করে পরিবারের হাল ধরেছেন পটিয়ার প্রতিবন্ধি নাছির।

জননেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী আদর্শিক রাজনীতির বরপুত্র ও ইতিহাসের নায়কের নাম- তসলিম উদ্দীন রানা

  • সময় বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬
  • ৫৯ পঠিত

 

বীর চট্রলার কিংবদন্তি জননেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী ছাত্রনেতা থেকে শ্রমিক থেকে জননেতা হয়ে চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের থেকে উঠে আসা এক সংগ্রামী ইতিহাসের নাম।তিনি চট্টলদরদী,মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্রগ্রামের ইষ্টার্নজোনের চেয়ারম্যান হিসেবে দেশ মাতৃকার এক কাব্যের নাম।তিনি একাধারে জাতীয় নেতা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা।

যতদিন এদেশ থাকবে ততদিন বীর জহুর আহমেদ চৌধুরীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।ইতিহাসের বীর সন্তান জহুর কোন কাল সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না, তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি আদর্শের মুর্ত প্রতীক। তাঁদের জীবন কেবল ঘটনাপঞ্জি নয়, বরং সংগ্রাম, ত্যাগ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য উপাখ্যান। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে তেমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র জহুর আহমদ চৌধুরী।তিনি একাধারে রাজনীতিবিদ,জনপ্রিয় চট্টলার মানুষের জনপ্রতিনিধি ও অবিসংবাদিত নেতা।তিনি ছিলেন ৫২ এর ভাষা সৈনিক,মহান মুক্তিযুদ্ধের ইস্টার্ন জোনের চেয়ারম্যান,সাবেক মন্ত্রী ও গণমানুষের প্রতিনিধি। চারটা মন্ত্রণালয় একাই চালাতেন।তিনি চট্টল প্রেমিক।আজীবন চট্টগ্রামের মানুষকে নিজের মানুষ মনে করতেন।এমন চট্টগ্রাম দরদী নেতা সেই বললে চলে।

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে যিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি ছিলেন জনতার কাতার থেকে উঠে আসা এক নির্লোভ রাজনীতিক ব্যক্তি ও ইতিহাসের নায়ক। যার নাম শুনলে চট্রলবাসী এক বাক্য তার অবদান শিকার করবে। তিনি ইতিহাস নন ইতিহাসের নায়ক,ইতিহাসের ধারক।তাদের দিয়ে বাঙালির ইতিহাস রচিত।

১৯১৬ সালে চট্টগ্রামের উত্তর কাট্টলী ততকালীন গ্রাম বর্তমানে শহর জন্ম নেওয়া জহুর আহমদ চৌধুরীর রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে সেই ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে, সেই কৈশোরেই ছিলেন একজন ছাত্র রাজনীতির লিজেন্ড । ছাত্রজীবন থেকেই তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। কলকাতায় গিয়ে তিনি উপমহাদেশের রাজনীতির নানা ধারার সঙ্গে পরিচিত হন। সেখানে মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামবাদী, ফজলুল কাদের চৌধুরী ও আবুল খায়ের সিদ্দিকীর মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সংস্পর্শে আসেন।তারপরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে থেকে তার বণাট্য রাজনীতি
শুরু। শুরুর দিকে মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের ছাত্রনেতা থেকে মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন পরে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শুরু করেন।

১৯৩৭ সালে কলকাতার খিজিরপুরে ডক শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁর শ্রমিক রাজনীতির সূচনা। শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ-কষ্টকে তিনি নিজের জীবনের অংশ করে নিয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন চট্টগ্রাম ডক শ্রমিক ইউনিয়ন। এই সংগঠন পরবর্তীকালে চট্টগ্রামের শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত হয়।শ্রমিক আন্দোলনের পথিকৃৎ ছিলেন। শ্রমিক রাজনীতি থেকে জননেতা।

এই সময়েই তাঁর পরিচয় হয় তরুণ রাজনৈতিক কর্মী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক আদর্শ ও নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তার রাজনীতির বীজ বপন করেছিলেন।

১৯৪৮ থেকে ১৯৫২—বাঙালির ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে জহুর আহমদ চৌধুরীর ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভাষার জন্য তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে যা আজীবন চট্টগ্রাম বাসী স্মরণ রাখবে। চট্টগ্রামে তাঁর আন্দরকিল্লার শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয় হয়ে উঠেছিল ভাষা আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র। আদর্শগত ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ভাষার দাবিতে সব পক্ষের আন্দোলনকারীদের সহযোগিতা করেছিলেন।আজ আমরা মাতৃভাষায় পেলাম বীর জহুর আহমেদ চৌধুরীর মত নেতাদের কারণে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঢাকার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চট্টগ্রামেও যখন আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে, তখন জহুর আহমদ চৌধুরী ছিলেন রাজপথের অগ্রভাগে। তাঁর নেতৃত্বে মিছিল বের হয়, সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ভাষার অধিকারের দাবিতে চট্টগ্রামের মানুষ সংগঠিত করে হাজার হাজার লোক দিয়ে মিছিল মিটিং করে দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। তিনি বিশ্বাস করতেন—একটি জাতির ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা ছাড়া তার আত্মপরিচয় পূর্ণতা পায় না।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জহুর আহমদ চৌধুরী এক ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেন। মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ও ধনাঢ্য প্রার্থী রফিউদ্দিন সিদ্দিকীকে পরাজিত করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, জনগণের ভালোবাসার কাছে অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব ক্ষণস্থায়ী। কলকাতার দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা এই বিজয়কে ব্যাখ্যা করেছিল—“মক্ষিকার কাছে হস্তীর পরাজয়” হিসেবে।

পরবর্তী সময়ে ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের পুনর্গঠনের সময় বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তাঁর জীবনযাপন ছিল সাধারণ মানুষের মতোই। ব্যক্তিগত সম্পদ বা ভোগ-বিলাসের প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিল না।

জহুর আহমদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর জাতীয় সংসদে দেওয়া শোক প্রস্তাবের আলোচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সততা ও ত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেছিলেন—জহুর আহমদ চৌধুরীর জীবনে চাওয়া-পাওয়ার কিছু ছিল না; তিনি যা উপার্জন করতেন, তা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতেন।

বঙ্গবন্ধুর সেই বক্তব্য শুধু একজন সহযোদ্ধার প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং একজন আদর্শ রাজনীতিকের মূল্যায়ন। কারণ জহুর আহমদ চৌধুরীর রাজনীতি ছিল ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের জন্য,দেশের জন্য।তিনি দেশপ্রেমিক ও আদর্শিক রাজনীতির লিজেন্ড।

১৯৭৪ সালের ১ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জানাজায় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন প্রমাণ করে—তিনি ছিলেন কেবল একজন মন্ত্রী নন, তিনি ছিলেন একটি সংগ্রামী ইতিহাসের অংশ।তিনি ছিলেন জাতীয় বীর, ইতিহাসের নায়ক। তিনি আমাদের প্রেরণা,আইডল।

আজ যখন রাজনীতিতে ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার মোহ ও নৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা হয়, তখন জহুর আহমদ চৌধুরীর জীবন আমাদের সামনে এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। বেশী করে তাকে ধারণ করতে হবে।তাদের ইতিহাস তুলে ধরতে হবে।তিনি কে? তার পরিচয় কি? তিনি কেন আমাদের রাজনীতির আইকন? তিনি কেন দেশ মাতৃকার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলেন? কেন তিনি লিজেন্ড? মৃত্যুঞ্জয়ী বীর? কি তার পরিচয়?

আদর্শিক রাজনীতির বরপুত্র।আমাদের অবিসংবাদিত নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী দেখিয়ে দিয়েছেন —রাজনীতি হল পরের জন্য,আত্বত্যাগ হল উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।দেশপ্রেম হল আমাদের অঙ্গীকার।মানুষ হল আসল আর মানুষের ভালোবাসার এবং আদর্শের পথ চলা আমাদের পাথেয়। জনতাই আমাদের শক্তি।

চট্টগ্রামের ইতিহাসে তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও নেতা নন; তিনি ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি ও অধ্যায়—যার প্রতিটি পৃষ্ঠা লেখা আছে শ্রমিকের ঘামে, ভাষার দাবিতে, স্বাধীনতার স্বপ্নে এবং মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়। ইতিহাসের নায়ক বীর চট্রলার সন্তান আজও আমাদের নিকট ভালবাসা ও শ্রদ্ধার নেতা।তিনি চির অম্লান, চির অমর,চিরন্তন। তার আদর্শ তাকে আজীবন মানুষের হৃদয়ে বেচে আছে, থাকবে।
যতদিন বীর চট্রলার ইতিহাস রচিত হবে সর্বাগ্রে বীর জহুর আহমেদ চৌধুরীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে গেছেন যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশীর্বাদ।তার আদর্শ ধারণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
১৯৭৪ সালে ৪ জুন নিও ব্রংকাইটিস রোগে আক্রান্ত হলে জননেতা জহুর আহমেদ চৌধুরীকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।২৮ জুন বঙ্গবন্ধু তাকে দেখতে হাসপাতালে যান। ৩০ জুন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জহুর আহমেদ চৌধুরীর শেষ দেখা হয়। ১৯৭৪ সালের ১ জুলাই সকাল ৬.৪৫ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সেদিন দুপুর ২-৩০ মিনিটে জহুর আহমেদ চৌধুরীর লাশ বিমানযোগে চট্টগ্রাম আনা হয়। ২ জুলাই সকাল ১০-৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে তার নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয় এবং দুপুর ১২ টায় চট্টগ্রাম দামপাড়ায় তার বাসভবন সংলগ্ন পারিপারিক কবরস্থানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়।জাতীয় বীর আজও মানুষের ভালবাসায় ও শ্রদ্ধায় চিরশায়িত আছেন।

লেখকঃ
লেখক,গবেষক ও অধ্যাপক।

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
কপিরাইট © ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট