
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো; অপরাধী শাস্তি পাবে, কিন্তু নিরপরাধ ব্যক্তি কোনোভাবেই হয়রানির শিকার হবে না। আধুনিক বিচারব্যবস্থার মূল দর্শনই হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত একটি বিষয় হলো ‘অজ্ঞাত আসামি’ বা ‘অজ্ঞাতনামা আসামি’ অন্তর্ভুক্ত করে মামলা দায়েরের প্রচলন। আইনগতভাবে এর একটি যৌক্তিক ভিত্তি থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে এটি বহু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগ, ভোগান্তি এবং নাগরিক অধিকার হরণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (Code of Criminal Procedure)-এর আওতায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা না গেলে তদন্তের স্বার্থে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুযোগ রয়েছে। বিশেষত দাঙ্গা, সহিংস বিক্ষোভ, নাশকতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনায় এই বিধান তদন্তকারী সংস্থাকে অপরাধী শনাক্তকরণের একটি প্রয়োজনীয় সুযোগ প্রদান করে। কারণ অনেক সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের পরিচয় নির্ধারণ করা তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব হয় না।
তবে সমস্যার সূচনা হয় তখন, যখন এই ব্যতিক্রমধর্মী আইনি বিধানটি প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে একটি নিয়মিত প্রশাসনিক চর্চায় পরিণত হয়। রাজনৈতিক সংঘাত, আন্দোলন, জনসমাবেশ কিংবা সংঘর্ষের ঘটনার পর দায়ের হওয়া বহু মামলায় দেখা যায়, কয়েকজন নামীয় আসামির পাশাপাশি শত শত কিংবা হাজার হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ফলে মামলার প্রকৃত পরিধি অস্পষ্ট হয়ে পড়ে এবং তদন্তের ক্ষমতা প্রায় সীমাহীনভাবে বিস্তৃত হয়ে যায়।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ নাগরিক। কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক, ছাত্র, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী কিংবা ঘটনাস্থলের আশপাশে উপস্থিত সাধারণ মানুষও অনেক সময় নিজেকে সম্ভাব্য আসামি হিসেবে বিবেচনা করতে বাধ্য হন। মামলার এজাহারে নাম না থাকলেও পরবর্তীতে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার আশঙ্কা থেকে যায়। এর ফলে সমাজে এক ধরনের নীরব ভীতি ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও জীবন রক্ষার সাংবিধানিক গ্যারান্টি প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি জানেন না তিনি কোনো মামলার সম্ভাব্য আসামি কি না, কিংবা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই তদন্তের আওতায় আসার ঝুঁকিতে থাকেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে; তার সাংবিধানিক নিরাপত্তা কতটুকু কার্যকরভাবে সুরক্ষিত রয়েছে?
অজ্ঞাত আসামির মামলার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর অপব্যবহারের সম্ভাবনা। মানবাধিকার কর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের মামলা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা, ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যক্তিগত শত্রুতা চরিতার্থ করা কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এমন অভিযোগও রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলে তদন্তের নামে পরবর্তীতে তাকে মামলার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথাকথিত ‘প্রসেস অ্যাজ পানিশমেন্ট’ বা ‘প্রক্রিয়াই শাস্তি’ তত্ত্ব। আধুনিক বিচারতত্ত্বে বহুল আলোচিত এই ধারণার অর্থ হলো; চূড়ান্ত বিচারে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও মামলা, গ্রেপ্তারের আশঙ্কা, জামিনের প্রক্রিয়া, আদালতে বারবার হাজিরা, আর্থিক ব্যয় এবং সামাজিক মানহানির কারণে একজন ব্যক্তি যে দুর্ভোগের শিকার হন, সেটিই কার্যত এক ধরনের শাস্তিতে পরিণত হয়। ফলে বিচার পাওয়ার আগেই একজন নাগরিক মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
বাস্তবে এ ধরনের মামলাকে ঘিরে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো সুযোগসন্ধানী ও অসাধু মহলের সক্রিয়তা। মামলার ভয় দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা আদায়, প্রভাব খাটানো, ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণের মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। ফলে আইন তার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে অনেক সময় ভয়ের উপকরণে পরিণত হয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে। ১৯৪৮ সালের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার (Universal Declaration of Human Rights) ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কাউকে খামখেয়ালিভাবে গ্রেপ্তার, আটক বা নির্বাসিত করা যাবে না। একইভাবে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি (ICCPR)-এর ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশও এই নীতিগুলোর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
তবে এটাও সত্য যে, অজ্ঞাত আসামির বিধান সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় নয়। বৃহৎ সহিংসতা, সংঘবদ্ধ অপরাধ বা নাশকতার ঘটনায় অপরাধীদের তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা প্রায়ই সম্ভব হয় না। ফলে তদন্তের স্বার্থে এই বিধান বজায় রাখা প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রয়োজন যেন কখনো নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার অজুহাতে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, অজ্ঞাত আসামি অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, ডিজিটাল ফরেনসিক্স, মোবাইল ডাটা অ্যানালাইসিস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শনাক্তকরণ প্রযুক্তিসহ আধুনিক তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। তৃতীয়ত, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে অসৎ উদ্দেশ্যে মামলায় জড়ানো প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, আদালতের প্রাথমিক তদারকি, তদন্তের গুণগত মান যাচাই এবং অভিযোগপত্র পর্যালোচনার ক্ষেত্রে বিচারিক নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে।
একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন কখনো ভয়ের প্রতীক হতে পারে না; আইন হতে হবে ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থল। অজ্ঞাত আসামির মামলা যদি অপরাধী শনাক্তকরণের প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হয়, তবে সেটি অবশ্যই সংবিধান, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্যথায় এটি অপরাধ দমনের উপকরণ নয়, বরং নাগরিক স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের জন্য এক গভীর সংকটে পরিণত হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধীকে খুঁজে বের করা নয়; রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিরপরাধ মানুষকে ভয়মুক্ত রাখা। কারণ ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ কেবল অপরাধীর শাস্তি নয়, বরং নিরপরাধ মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আর সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত রয়েছে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসনের প্রকৃত সার্থকতা। অন্যথায় আইন জনগণের আশ্রয়স্থল না হয়ে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, আর ন্যায়বিচার তার নৈতিক ভিত্তি হারাবে। তাই সময়ের দাবি- অপরাধ দমনে কার্যকর রাষ্ট্র এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় দায়বদ্ধ রাষ্ট্রের মধ্যে একটি সুস্থ ও টেকসই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। ন্যায়বিচার তখনই পূর্ণতা পায়, যখন রাষ্ট্র অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর এবং নিরপরাধের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন থাকে।
লেখক পরিচিতি: কলাম লেখক ও সংগঠক; সেক্রেটারী, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিট।
Leave a Reply